সৎ সঙ্গে স্বর্গে বাস

সেহাঙ্গল বিপ্লব আল মোজাদ্দেদি

সম্মানিত পাঠকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ, আপনারা লেখার কলেবর একটু বড় দেখে পড়া থেকে এরিয়ে যাবেন না। একটু ধৈর্য নিয়ে যেকোন বিষয়ের শেষ পর্যন্ত না গেলে তার মর্ম বা স্বাদ আস্বাদন করা কখনোই সম্ভব হয় না। কারণ, সব ভালো তার শেষ ভালো যার। অতএব সবসময় সব ভালো অল্প কথায় শেষ করা যায় না। তাই এ নিবন্ধটি শেষ পর্যন্ত পড়ার আমন্ত্রণ করছি। বাংলা ভাষায় বহুল প্রচারিত প্রবাদ, ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’ ইসলামী আধ্যাত্মবাদের ভাষায় সৎসঙ্গ অর্থ্যাৎ, কামেলপীর বা মুর্শিদের সোহবত বা সঙ্গলাভই হলো সৎসঙ্গ। আমরা কি সব সময় সব কাজে এই সৎ সঙ্গের গুরুত্ব মেনে চলি? বা চলতে পারছি? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদের কাছেই আছে। কেবল নিজেরাই জানি যে, কে কখন কার বা কোন ধরণের সঙ্গ নিচ্ছি? সে সঙ্গ প্রকৃতপক্ষে কতটুকু সৎ আর কতটুকু অসৎ? আল্লাহতায়ালার দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে কোন কিছুই করা সম্ভব নয়। সবাই জানি, মন্দ কাজের ফলাফল মন্দ। ভালো কাজের ফলাফল ভালো। তাহলে আমরা সারাদিনে কিংবা সারাজীবনে কতটুকু ভালো, আর কতটুকু মন্দ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকি? দিন শেষে হিসেব করলেই ফলাফল পেয়ে যাবো। আমরা না জেনেও অনেক মন্দ কাজ করে থাকি। যখন বুঝতে পারি যে, এটি ভালো কাজ নয়, তবু অনুতপ্ত হই! যার অন্তর মন্দ কাজের প্রতি নিবিষ্ট সে সহজে অনুতপ্ত হতেও পারি না।

জীবনের তাড়নায় চারিদিকে এত অসৎ মানুষ, আর তাদের অসৎ কাজকর্ম দেখে দেখে অবলীলায় সৎ মানুষের সঙ্গ এরিয়ে চলা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এ অভ্যাস যে কত ক্ষতির তা যদি তাৎক্ষণিক বুঝতে পারতাম, তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব ভুলে আত্মিক উন্নতির কথা ভেবে সৎ ও সত্যবাদি মানুষের সঙ্গলাভ করতাম। কিন্তু আমরা সাধারণ, বেহুঁশ-বেকারার সংসারের জ্বালায় ক্ষণকালীন দুনিয়ার মোহে অগণিত কালের আখেরাতকে ভুলে থাকি! যা বান্দার কাজ হতে পারে না। যে পরপারে সময়ের সীমা পরিসীমা নেই, সেখানে বসবাসের জন্য যে পুঁজির দরকার, সে পুঁজি এখান থেকেই কামাই করে নিয়ে যেতে হবে। অর্থ্যাৎ এখান থেকেই আল্লাহতায়ালাকে দেখে চিনে যেতে হবে। এখানে সাময়িক অর্থাভাবে পড়লে কারো কাছে ধার-দেনা নিয়ে চলা যায়, কিন্তু আখেরাতে ধার-দেনার সুযোগ নেই। সেখানে গর্ভধারণী মা চিনবেন না প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে। সন্তান চিনবেন না পরম মমতাময়ী মাকে। এ যে কী পরিমাণ পরিতাপের তা একবার চিন্তা করলেও ভয়ে মাথা ঝিম ধরে আসে। এ নিবন্ধে যে সৎ মানুষের সঙ্গলাভের আলোচনা করছি, তিনি হবেন একজন সত্যবাদি আল্লাহওয়ালা মানুষ। যে মানুষের আপন গুণাবলীর প্রভাবে, আমাদের মতো সাধারণেরা খারাপ অভ্যাস বা স্বভাব ত্যাগ করে ভালো মানুষে পরিণত হয়। যেমন পরশ পাথরের ছোঁয়া পেলে জংধরা লোহা খাঁটি সোনা হয়। মন্দ মানুষের অন্তর থাকে দুনিয়াবী চিন্তায় কলুষিত, সেখানে সু-অনুভূতি প্রবেশ করতে পারে না। শুধু দুনিয়ার চিন্তা গ্রাস করে বসে, পরপারের জন্য অন্তরে কোন অনুভূতিই হয় না। অনুভূতিশূন্য মানুষ পশুর সমান। এ দুনিয়ার সুখ-শান্তির জন্য যারা চিন্তা করে তাদের জন্য এ দুনিয়াই দোজখ। চিন্তা আর অনুভূতি প্রকাশ একসঙ্গে হয় না, দুশ্চিন্তা দূর করলেই কেবল অন্তরে সুকোমল অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কী করে দুশ্চিন্তার মতো মহামারী দূর হবে? এর উত্তরে বিনা দ্বিধায় বলা যায়, একজন আল্লাহওয়ালা কামেল মুর্শিদের সঙ্গ নিয়ে তাঁর প্রতি নিষ্ঠাবান হলেই দুনিয়াবী কুচিন্তার দুয়ার বন্ধ হয়ে যাবে। এবং ধীরে ধীরে অন্তরে আল্লাহকে পাওয়ার অনুভূতির প্রভাব বিস্তার করবে। আল্লাহতায়ালা স্পষ্ট বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের স্রষ্টার ইবাদত করো, স্রষ্টা তোমাদের রিজিক দান করবেন। আরো বলেছেন, তোমরা উছিলা অন্বেষণ কর।’ দুনিয়ার বিত্ত-বৈভবের মধ্যে থাকার চিন্তা দ্বারা নয়, শুধুমাত্র নি:স্বার্থ অনুভূতির দ্বারাই পরম স্রষ্টাকে আলিঙ্গন করা যায়। অন্ধকার আদিম যুগের কথা নয়, হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এইসব কামেল মানুষের সঙ্গ নিয়েই স্বর্গশুধা লাভ করেছেন। ইতিহাসের পাতায় পাতায় এর দৃষ্টান্ত রয়েছে বহু । কিন্তু অনেক মানুষ পীর-মুর্শিদের সঙ্গ বা তাঁদের পবিত্র দরবার পছন্দ করেন না। তারা বলেন, ‘পীরের দরবারে গেলে কী পাওয়া যায়? তাঁরা কি বেহেশত পাইয়ে দিবেন? তাঁরা নিজেরাই তো নিজেদের খবর জানেন না যে, তাঁরা কোথায় যাবেন বেহেশতে না দোজখে! সেখানে আমাদেরকে তিনি কীভাবে বেহেশত পাইয়ে দিবেন?’ এমন নানা ধরণের প্রশ্ন তাদের মনে। এসব প্রশ্নের উত্তরে বলছি, একজন আল্লাহওয়ালা কামেল মুর্শিদের পবিত্র দরবার সৎসঙ্গ স্থল। আর মুর্শিদ হলেন সৎসঙ্গ দাতা। যার সান্নিধ্যে গেলে মানুষের মাথা থেকে কু-চিন্তা দূর হয়ে অন্তরে সৎভাব বা সুন্দর অনুভূতির উদয় ঘটে। তখন সে মানুষও আল্লাহওয়ালা মানুষে রূপান্তরিত হতে থাকেন। একেই বলে ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গে বাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।’ আর সে জন্যই মানুষ ধরার কথা বলা হয়েছে এবং কোন ধরণের মানুষ ধরতে হবে, সে কথাও পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলে দিয়েছেন, ‘তোমরা সত্যবাদিগণের সঙ্গী হয়ে যাও। এবং তাঁদের আদেশ-নিষেধ পালন করো।’ যারা কোরআন পড়তে জানেন তারা নিশ্চয়ই এ কথায় দ্বিমত করবেন না। প্রকৃতপক্ষে কালে কালে তাঁরাই সৎ ও খাঁটি আলোকিত মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে থাকেন। তাঁদের সঙ্গলাভ করতে পারলেই কেবল অন্তরে মন্দ কাজের প্রভাব বাসা বাঁধতে পারে না। এ নিবন্ধকারের মতো লক্ষ-কোটি মানুষের প্রাণপ্রিয় মুর্শিদকেবলা বলেন, ‘যাদের অন্তরে এক আল্লাহর প্রতি ভয় ও রাসুল (সঃ) এর প্রতি মহব্বত নাই, তারা কোনদিন আল্লাহর দেখা পাবে না।’ আবার নাস্তিকেরা বলেন, যারা ইবাদত করে আর যারা ইবাদত করে না সবাই তো মরবে, তাহলে ইবাদত করে সময় নষ্ট করে কী হবে? নাউজুবিল্লাহ! আসলে ইবাদত করে যে ব্যক্তি মানুষ হয়েছেন কিংবা মানুষ হওয়ার জন্য আল্লাহর ইবাদত করেন, সেই মানুষের কখনোই মৃত্যু হয় না। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা দিয়েছেন এভাবেÑ ‘কুল্লি নাফসীন জাইকাতুল মাউত।’ অর্থ: প্রতিটি নফসকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ অতএব মানুষ মরে না, মরে তার ‘নফস’ ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা বা চাওয়া-পাওয়া। পবিত্র কোরআনের কোথাও কি উল্লেখ আছে মানুষ মরে? এখানে জীব ও পরমের মধ্যে ব্যবধান যোজন যোজন। মানুষ রূপে জন্মালেই মানুষ হওয়া যায় না। জীবনে মানুষ হতে চাইলে, খাঁটি মানুষের সঙ্গ ছাড়া বিকল্প নাই। আর খাঁটি মানুষই হলেন পরমের সঙ্গে নিজের আত্মাকে বিলিন করে দেওয়া পবিত্র এক মহা-আত্মা, যে আত্মার মৃত্যু হয় না। শুধু জীবের মৃত্যু অবধারিত। আধ্যাত্মবাদের গুণী সাধকরাও তা-ই বলেছেন যেমন, ‘মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।’ এ কথার অর্থ দিন ছাড়া যেমন সূর্য দেখা যায় না, তেমনই মানুষ ছাড়া মানুষ চেনা-জানা যায় না। তাই মানুষ ছাড়াও মহান আল্লাহকে চেনা-জানার কোন পথ নাই। একটি গাছের শিকড়ই তার শক্তি শিকড়হীন গাছ তো গাছই না, সে মরা কাঠ বা লাকড়ি। তাই, একজন কামেলপীর হলেন সাধারণ মানুষের ভিতরের মানুষ বা মূলকে চেনার মাধ্যম। অতএব এ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, কামেল মানুষের সঙ্গ ছাড়া জীবনের কোন মূল্য নেই। তিনিই পারেন আল্লাহকে পাওয়ার পথ দেখিয়ে দিতে। মহান আল্লাহরই কৃপায় কঠোর রিয়াজত ও সাধনার মাধ্যমে তিনি জেনেছেন সেই পথের গন্তব্য।

সম্মানীত পাঠক, ইসলাম ধর্মের তরিকত ও মারেফত নিয়ে যারা কটাখ্য করেন, তাদের ব্যাপারে একটা উদাহরণ দিলে তারা সহজে বুঝতে পারবেন যেমন, আমরা চোখের সামনে যা কিছু দেখি, তার চেয়ে কতশত বেশি দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকে যায়, যা আমরা দেখতে পাই না! এখন কথা হলো, যা দেখা যায় না, তা গোপন বা মারেফত। হাদিস শরীফে আছে, ‘তালাবুল ইলমি ফারীদাতুন আ’লা কূল্লি মুসলিমিঁউ ওয়া মুসলিমাতিন।’ অর্থ: ইলম শিক্ষা নর-নারী উভয়ের জন্য ফরজ। ইলম দুইপ্রকার (এক) ইলমে শরিয়ত ও (দুই) ইলমে ফারেফত। আল্লাহকে পাওয়ার জন্য দুইপ্রকার ইলম অর্জন করা অবশ্যই প্রয়োজন। শরিয়তের ইলম দুনিয়ার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই পাওয়া যায়। কিন্তু ইলমে মারেফত শিখতে হলে কামেলপীর ধরা প্রয়োজন, যাঁর কাছে ইলমে শরিয়ত ও ফারেফত এ দুইপ্রকারের ইলম আছে। ইলম অর্থ জ্ঞান। একজন আধ্যাত্মিক সাধক আধ্যাত্মিকতার মহাজ্ঞানের শক্তিতে শক্তিমান। তিনি সেই শক্তির মাধ্যমে বাতেন বা গোপন, অদেখা স্থান আর অজানা বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন। এই দেখা আর জানার মাধ্যম হচ্ছে গোপন বা বাতেনী জ্ঞান। এ কথা বিশ্বাস না হলে কুতুববাগ দরবার শরীফে কুতুববাগী পীরকেবলাজানের কাছে একবার আসুন, এবং জেনে যান তাঁর অধ্যাত্মিক জ্ঞান সম্পর্কে। তিনি সাধারণকে এ জ্ঞান অর্জন করাতে এবং অজানাকে জানাতেও পারেন। তাই আল্লাহকে দেখা বা চেনার ইচ্ছা থাকলে শিক্ষিত-অশিক্ষিত আর প-িতসহ সবাইকে আধ্যত্মবাদের চেতনায় শামিল হতে হয়। কারণ, কামেল পীরের কাছে বাইয়াত নিয়ে স্ব-স্ব কলবের সালিম করেই কেবল মুমিনের দরজা লাভ করতে হয়। ইয়াজিদী মতবাদী বাতিল পন্থার মৌলভীদের ফতোয়া শুধু আত্মঘাতীই নয়, সাধারণের জন্য চরম বিপদেরও। তাই, সচেতন পাঠকের কাছে যুক্তি ও সত্যতা যাচাইয়ের ভার দিয়ে এ লেখা শেষ করছি।

(Visited 16 times, 1 visits today)
Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *