বাতেনী জ্ঞান

সাইফুল ইসলাম দীপক

সাধারণত জ্ঞান বলতে বুঝি বইপুস্তকে যা পাওয়া যায় তা-ই। যে যত বইপুস্তক পড়েছেন, ডিগ্রি অর্জন করেছেন আমাদের কাছে মনে হয় তিনিই তত বেশি জ্ঞানী। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে মনে করি অনেক বড় জ্ঞানী হলাম! আপাত দৃষ্টিতে তা মনে হলেও আসল জ্ঞান আরও গভীরে। বইপুস্তকের জ্ঞান এক ধরনের বাহ্যিক বা শরিয়তি জ্ঞান, যে জ্ঞানের মাধ্যমে দুনিয়াতে কোনরকম চলা যায়। কিন্তু আরেক রকম জ্ঞান আছে, যা ধ্যানের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। সে জ্ঞানের কোন সীমা পরিসীমা নেই। যেমন ধরুন, সাগরের মধ্যে একটিকয়েন ছুড়ে দেয়া হলে সেই সিকি তলিয়ে যাবে এবং তা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তেমনি মোরাকাবা বা ধ্যানের মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে, তা ওই সাগর সমতুল্য, যেখানে বইপুস্তকের জ্ঞানের বড় বড় ডিগ্রি ছুড়ে ফেললে তা আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

কিছুদিন আগে আমার এক আত্মীয় অনেকটা তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, তুমি তো ইঞ্জিনিয়ার, তুমি যে পীরের কাছে যাও উনি কি তোমার চেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বেশি জানে? আমি বলেছিলাম, শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং না, তিনি যেকোন বিষয়েই গভীর জ্ঞান রাখেন, বিশদভাবে জানেন ও সঠিক চিন্তায় সহজেই বুঝেন। তখন আমার আত্মীয়ের চেহারা দেখে মনে হল উনি ভাবছেন, ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এই ধরনের কথা শোনার অভিজ্ঞতা আমার অনেকবার হয়েছে। আমিও একসময় তা-ই ভাবতাম, যখন পর্যন্ত আল্লাহতায়া’লা আমাকে এই কামেল অলির সান্নিধ্যে আনেননি। আমার গুরু, আমার পীর-মুর্শিদ যখন বলতেন, বাবা জ্ঞান দুই প্রকার, একটা জাহেরী, অন্যটা বাতেনী জ্ঞান। জাহেরী জ্ঞান সীমিত। কিন্তু বাতেনী জ্ঞানের কোনো সীমা পরিসীমা নেই।

সত্যি কথা বলতে কি আমি তরিকায় আসার প্রথম দিকে খাজাবাবা কুতুববাগী ক্বেবলাজান হুজুরের পবিত্র মুখে বিভিন্ন বিষয়ের উপর জ্ঞানগর্ভ অনেক আলোচনা শুনতাম। কিন্তু বুঝতাম না। এই মহান গুরু বা শিক্ষকের সান্নিধ্যে থেকে ধীরে ধীরে তাঁর অসীম দয়ায় কিছু কিছু বোঝার সুযোগ হয়েছে। এ জ্ঞান শুধু বস্তুজগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অতিন্দ্রিয় জগতের সঙ্গে যার যোগাযোগ, যে জ্ঞান দ্বারা অসম্ভব কাজ সম্ভব হয়ে যায়। অনেক মানুষ আছেন যাঁরা কোরআন-হাদিস গবেষণা করছেন, আবার তাঁরা অন্যের সম্পর্কে অবলীলায় গীবত করে বেড়াচ্ছেন। যা কিনা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। তাই এ সম্পর্কে মহান সৃষ্টিকর্তা পরম করুণাময় আল্লাহতায়া’লা পবিত্র কোরআনে সবাইকে কঠিনভাবে সতর্ক করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বাস্তবে সাহাবা কেরামদের শিখিয়েছেন কীকরে গীবতের মত এতো বড় ক্ষমাহীন গুনাহ্ থেকে মুক্ত থাকা যায়। যুগে যুগে জমানার আউলিয়া, মোজাদ্দেদগণ তারই প্রতিফলন ঘটিয়ে সুশিক্ষার আলোয় মুছে দেন কলুষিত আত্মার ভ্রান্ত অন্ধকার।

আমি অত্যন্ত মূর্খ মানুষ। কোরআন হাদিস কিছুই পড়িনি। কিন্তু আমার মুর্শিদ-গুরু শিখিয়েছেন, কোনো মানুষ সম্পর্কে অনুমানে কিছু বলা মানেই গীবত। কারণ, তুমি অনেক কিছুই জানো না। একমাত্র আল্লাহতায়া’লাই জানেন ও সব খবর রাখেন। গীবত করা মহা পাপ। আমি অধম দাবি করি না যে, আমি গীবত করি না। আমিও করি অনেক সময়। কিন্তু বর্তমানে সরাসরি গীবতকারীদের থেকে পার্থক্য হল যে, এখন পরচর্চা করতে গেলেই ভিতর থেকে যেন কে বলে ওঠে, তোমার কথায় গীবত হচ্ছে! তখন নিজেকে সংশোধন করতে চেষ্টা করি। এই যে পরিবর্তন এটা বাতেনী শিক্ষা। এই শিক্ষার জ্ঞান লাভ করা সম্ভব শুধু আল্লাহর একজন কামেল অলি-বন্ধুর সান্নিধ্যে রুহানী তাওয়াজ্জুহ্ বলে। অনেকে বলেন, অলিআল্লাহ আবার কি? এই রকম আবার আছে নাকি! মানুষ সবাই সমান। আমি বলি আছে ভাই, আছে। কিছু মানুষ আছেন যাঁরা অসাধারণ। এখানে অসাধারণ বলতে আমি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বুদ্ধিজীবী, গবেষক, পন্ডিত , কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানীদের কথা বলছি না। বলছি, এ সব জ্ঞানের উপরে যে জ্ঞানের জগৎ আছে, সেই জ্ঞানের অধিকারী অসাধারণ ব্যক্তিত্বদের কথা। যাঁদের এক নজর দেখলেই মনে হবে অসাধারণ! তখন তাঁকে আর মাপকাঠিতে ওজন করার প্রয়োজন হয় না।

আমরা তো সব বিচার বিবেচনা করি আমাদের সীমিত সাধারণ জ্ঞান দিয়ে। এটা করতে পেরেই মনে হয় আমি সেরা। আমার কোনো দোষ নেই। আমরা নিজেকে বাদ দিয়ে অন্য মানুষের দোষ খুঁজি। কিন্তু আমার মুর্শিদ-গুরু আমাকে শিখালেন অন্যের দোষ তালাশ করার আগে নিজের দোষ তালাশ কর। তোমার নিজের ভিতরেই কত দোষ। তুমি কেনো অন্যের দোষ খুঁজতে যাও। নিজের ভিতরে যে ছয় রিপুর ছয়টি দানব আছে, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর এবং তাদের পরাজিত কর। এই রিপুগুলোকে দমন করতে পারলেই তোমার আত্মা শুদ্ধ হবে এবং আত্মা শুদ্ধ হলেই দিল জিন্দা (জাগ্রত) হবে। যখন এই স্তর পার করতে পারবে তখনই আসবে নামাজে হুজুরী। নামাজে হুজুরী বা একাত্মতা ছাড়া কোনো নামাজই আল্লাহর দরবারে পৌঁছে না এবং তা কবুল হয় না। এত সুন্দর মূল্যবান কথা আমি খাজাবাবা কুতুববাগী ছাড়া অন্য কারো কাছে কখনো শুনিনি।

ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি নামাজ পড়। নামাজ না পড়লে গুনাহ্ হবে, অমুক শাস্তি, তমুক শাস্তি হবে। এ সব ভয় ভীতির কথা আমার মনে কখনো দাগ কাটতো না। আমার মুর্শিদ-গুরুর কাছে শুনলাম, শুধু ভয় দিয়ে কিছু হবে না। ভয়ের সঙ্গে প্রেম না থাকলে তাতে কোনো কাজ হয় না। এই প্রথম ভালো লাগল। আরো শুনলাম, মহান আল্লাহতায়া’লা অতি দয়ালু এবং মহান আল্লাহর সঙ্গে প্রেম হলেই কেবল ইবাদত-প্রার্থনায় আনন্দ পাওয়া যায়। এখন কথা হল যাঁকে দেখিনি, তাঁর সঙ্গে প্রেম হবে কেমন করে? এ প্রশ্নের উত্তর জানার পর থেকে এই প্রথম নামাজ আদায় করে স্বাদ-মজা পেলাম।মনের ভিতর যখন কারো জন্য প্রেম উদয় হয়, তখন তার কথাই শুধু মনে পড়ে। তখন অন্য কিছুই আর গভীরভাবে মনে আসে না। তেমনি নিজের মনে আল্লাহর জন্য যখন প্রেম আসবে, তখনই কেবল খেয়াল আল্লাহর দিকে থাকবে। অন্যথায় সারাজীবন নামাজ পড়লাম কিন্তু খেয়াল থাকে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ধন দৌলতসহ দুনিয়ার বিভিন্ন চাহিদার প্রতি। এই নামাজের কি কোন সুফল আছে? এক কথায় উত্তর, নেই। এই উপলব্ধি যখন নিজের ভিতরে আসবে, শুধু তখনই বুঝা যাবে যে, আমার হুজুরী দিলে কবুলিয়াতের নামাজ হচ্ছে কি-না। তার আগে শোনা কথার অর্থ শুধু অন্যের মুখে ঝাল খাওয়ার মতো। তাতে কোনো লাভ নেই।

আরেকটা কথা বলে শেষ করি, বাতেনী জ্ঞান লাভ করতে হলে প্রথমে ছাড়তে হবে আমিত্ব-অহঙ্কার, আমি সব জানি, সব বুঝি, আমি মহাজ্ঞানী, এমন চিন্তাভাব চিরদিনের মত ত্যাগ করতে হবে। কারণ কোন একটা খালি পাত্র ভালো-মন্দ যেকোন জিনিস দিয়েই পূর্ণ করা যায়। কিন্তু মূল্যহীন জিনিসপত্র দিয়ে ভরে কোন ফল হবে না। ঠাসা কোন পাত্র সেখানে মূল্যবান জিনিস দিলেও তাতে ধরবে না। তাই ওই সমস্ত অহঙ্কারের গলা টিপে আমিত্বের অহমিকা হত্যা করে নিজেকে অহঙ্কারশূন্য পাত্রে পরিণত করতে পারলেই বাতেনী জ্ঞানে তা পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

আমরা দুই পাতার জ্ঞান অর্জন করেই ভাবতে শুরু করি, আমি অনেক জানি, আমি অনেক জ্ঞানী। কিন্তু আসলে বাতেনী জ্ঞান যখন নিজের ভিতর আসতে শুরু করবে, তখন শুধুই মনে হতে থাকবে, আমি কিছু জানি, আমি বা আমার বলতে কিছুই নেই। এই ভাব, এই জ্ঞান কামেল মুর্শিদের সাক্ষাৎ ছাড়া অর্জনের কোনো রাস্তা নেই। এখন শুধু মনে হয়, জীবনের এতগুলো বছর শুধু অকারণে অবহেলায় কেটে গেল। নিজেকে শুদ্ধ করার কাজ কিছুই হল না। কখন জানি পরপারের ডাক এসে নিভিয়ে দিবে পৃথিবীর আলো, পাড়ি জমাতে হবে অচেনা-অদেখা অন্ধকার দেশের উদ্দেশে। এরপর কি আর হবে এমন মানব জন্ম।

(Visited 1,914 times, 1 visits today)
Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *