পবিত্র ঈদুল আযহার শিক্ষা

সাইফুল ইসলাম দীপক

সকল বিষয়েরই আছে দুটি দিক। একটা বাহ্যিক, আরেকটা অন্তর্নিহিত। অথচ আজকাল আমরা সব কিছুর বাহ্যিক দিকটা নিয়েই বেশি ব্যস্ত। কিন্তু অন্তর্নিহিত অর্থটা বুঝতে চাই না। ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ বলতে আমরা শুধু বুঝি, পশু কোরবানি করা আর তা বিতরণ করা এবং নিজে খাওয়া। কিন্তু আমরা খুব কম সময়ই অন্তর্নিহিত অর্থটা নিয়ে ভাবি। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহপাকের নির্দেশে তাঁর প্রাণপ্রিয় সন্তানকে কোরবানি করেন। ইসলামের অত্যন্ত তাৎপর্যময় ঘটনা এটি। আল্লাহপাক হজরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর এই ত্যাগে খুশি হয়ে তাঁর সন্তানের পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি করান। এই অভুতপূর্ব ঘটনার মাধ্যমে ত্যাগের মহিমাই শিক্ষা দেন আল্লাহপাক। ত্যাগের মাধ্যমেই আল্লাহকে পাওয়া যায়। আর যে আল্লাহকে পেয়েছেন, দুনিয়ার এই জগৎ তঁাঁর কাছে অতি তুচ্ছ। কিন্তু আমরা দুনিয়ার জগৎকে পেতেই বেশি আগ্রহী, আল্লাহকে পাওয়ার ইচ্ছা আমাদের অন্তরে নাই বললেই চলে! আর তাই ত্যাগের শিক্ষাও আমাদের মধ্য থেকে যেন উধাও হয়ে যাচ্ছে। কেবল আছে ভোগের আকাক্সক্ষা। এই অতি ভোগের আকাক্সক্ষাই আমাদেরকে পশু বানিয়ে দিচ্ছে, আর সে কারণেই দুনিয়াতে জ্বালা, যন্ত্রণা, দুঃখ, কষ্ট লেগেই আছে। খুব কম সংখ্যক মানুষই অল্পতে তুষ্ট থাকতে পারি বলে আমার মনে হয়। যার যত আছে, তাঁর তত বেশি চাই। এই চাওয়া পুরণ করতে গিয়ে আমরা সব ভুলে উন্মত্ত হয়ে গেছি। অন্তরে এক হিংস্র পশু যেন সারাক্ষণ তাড়া করে ফিরছে। মানুষ খালি ছুটছে। কোনো স্থীরতা নাই মানুষের মধ্যে। তাই কোন শান্তিও নাই। অর্থকে মানুষ শান্তি মনে করছে। আর সেই অর্থ নামক শান্তিকে পেতে গিয়ে আরো অশান্তির মধ্যে পড়ছি। তবু আমাদের ভ্রুক্ষেপ হয় না। আমিও যে এর ব্যতিক্রম তা বলছি না। কিন্তু আজকে এটা জোর দিয়ে বলতে পারি কিছু হলেও অন্তরে পরিবর্তন এসেছে। ভোগের আকাক্সক্ষা কমে যাচ্ছে। কিছুটা হলেও আল্লাহকে পাওয়ার আকুতি অন্তরে তৈরি হয়েছে। আর এ সবই হয়েছে আমার মুর্শিদ কেবলার শিক্ষার কল্যাণে। এই শিক্ষা সবাই দিতে পারে না। একমাত্র আল্লাহর কামেল অলিগণ দিতে পারেন। তার কারণ মুখে মুখে জ্ঞানের কথা বলেন অনেক তথাকথিত জ্ঞানী। কিন্তু সত্যিকারের ত্যাগী মানুষ কেমন হয় তা আমার মুর্শিদ কেবলাকে না দেখলে বুঝতাম না। এখন বুঝতে পারি, যিনি আল্লাহকে পেয়েছেন তাঁর মধ্যে দুনিয়াবী কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণ থাকে না। দুনিয়া করেন বটে, কিন্তু তাতে তিনি আসক্ত নন। তাই আল্লাহপাক কোরআন শরীফে সুরা ইউনুসে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমার অলিগণের কোনো ভয় নাই, এবং তাঁরা কখনো চিন্তিতও হবেন না’। হবেনই বা কেনো? যিনি দুনিয়ার প্রতি আসক্ত নন তাঁর দুনিয়ার প্রতি ভয় থাকার কথাও নয়। আমাদের এত ভয়ের কারণ, আমরা দুনিয়ার প্রতি আসক্ত। আর দুনিয়াবী বস্তু হারিয়ে যাবার ভয় আমাদের সারাক্ষণ তাড়া করে ফিরে। অথচ আজ বা কাল এই দুনিয়া ছেড়ে আমাদের চলে যেতেই হবে। কিন্তু তাঁর পরেও এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ কমে না! আজকাল এই বিষয়গুলো বেশি বেশি মনে হয়। আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি, আমি তো এরকম ছিলাম না। আমারও তো অর্থ, সম্পদ, নাম, যশ, প্রতিপত্তি ইত্যাদিও প্রতি অনেক আকর্ষণ ছিল। আজ কেন এসব অর্থহীন মনে হয়! আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে এ কথাই কেন বেশি বেশি চিন্তা হয়। অনেকে ভাবতে পারেন, বয়স হচ্ছে হয়তো এই কারণে মৃত্যু চিন্তা আসছে। আমি অনেক মানুষ দেখেছি, অনেক বয়স হয়েছে কিন্তু দুনিয়ার চিন্তা তঁাঁদের ছাড়ে না। আসলে খাজাবাবা কুতুববাগীর কাছে এসে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্য তরিকার দাওয়াত গ্রহণ করে এবং তাঁর দেখানো রাস্তায় চলার কারণে আমার এই পরিবর্তন। আমি শুধু একা নই আমার মত আরো অগনিত মানুষ খাজাবাবা কুতুববাগীর শিক্ষা মত চলে তাঁদের মধ্যেও এই পরিবর্তন গড়তে স্বক্ষম হচ্ছেন। যারা এখনও খাজাবাবার সান্নিধ্যে আসেননি অনেকে ভাবতে পারেন যে, আমি মুর্শিদের গুণগান তো করবোই। আমি অধম সেই যোগ্য নই। সত্যি যদি পারতাম এই মহামানবের গুণ বর্ণনা করতে, তাহলে আমার জীবন ধন্য হত। লেখার মাধ্যমে অতি সামান্য চেষ্টা করি মাত্র। সত্যি আল্লাহকে পেতে হলে ত্যাগী হতেই হবে। আর ত্যাগী হতে হলে একজন ত্যাগী মানুষের সঙ্গ করতে হবে। এর বিকল্প কিছু নাই। আরেকটা শিক্ষা দেন খাজাবাবা। তা হলো নিজের নফসের সাথে জিহাদ। নিজের ভিতরের পশুকে কোরবানি করার শিক্ষা। খাজাবাবা আরো বলেন, ‘নিজের ভিতরের পশুটাকে বশ করেন। এখানেও একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করি আজকাল। আমার ভিতরে যে পশু আছে, তার চেহারা যেন একটু একটু করে  স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখন বুঝতে পারছি আসলে এই পশুই বশ করার কথা বলেন আমার মুর্শিদ। এর মধ্যে আছে ষড়রিপু- কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। কোনো কোনো সাধক কবি এদেরকে ছয়টা বলদ বলেও উল্লেখ করেছেন। এরাই আমাদেরকে তাড়া করছে সব সময়। খাজাবাবার কাছে শুনেছি আরো শত রিপু আছে মানুষের মধ্যে। এই সব জয় করেই তবে আল্লাহর কাছে পৌঁছানো যাবে। রিপু নামক এই সব পশু বশ করতে হলে প্রথমে তাদের চিনতে হবে। আর চেনার জন্য একজন কামেল অলিআল্লাহর কাছে যেতে হবে, যার কাছে সেই বিশেষ জ্ঞান বা ইলমে লাদুন্না আছে। যেই জ্ঞান শুধু সিনায় সিনায় বিতরণ হয়, কোনো বই পুস্তকে পাওয়া যায় না। সেই জ্ঞান নিয়ে বসে আছেন খাজাবাবা কুতুববাগী আপনার আমার জন্য। এবং এর লক্ষ্য একটাই তা হলো, আল্লাহর পথ ভুলে থাকা মানুষদেরকে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনা। এই লেখা লিখতে লিখতেই মনে একটা নতুন শক্তি অনুভব করছি। নিজের ভিতরের পশুকে বশ করে ত্যাগের পথ অতিক্রম করে আল্লাহকে পেতে হবে। আল্লাহপাক আমাকে এবং সকলকে কবুল করুন, আমিন।

(Visited 15 times, 1 visits today)
Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *