তরিকতের দীক্ষা নিয়ে ব্যক্তিগত উপলব্ধি

সেহাঙ্গল বিপ্লব

বসত বাড়ির আলো আছে কল্বের ঘরে অন্ধকার
সে পাবে না আল্লাহর দেখা কল্বের মুুখ বন্ধ যার।

পাপ করি আর পুণ্য করি,
যে যা-ই করি ভাই মুসলমান
আল্লাহকে না পাওয়া গেলে সবই যে হবে অবসান।

আমার কামেল মুর্শিদকেবলাজান খাজাবাবা কুতুববাগীর অমূল্য আদর্শের অন্যতম প্রথম শিক্ষা ‘আত্মশুদ্ধি’। যদিও এ বিষয়ে গভীর জ্ঞান আমার নেই, তবু মুর্শিদকেবলাজানের ‘দান’ খাস তাওয়াজ্জ্বহ্-বলে কয়েকটি কথা লিখতে চেষ্টা করছি। বিজ্ঞানের এই যুগে প্রত্যেক মানুষের চলাচল এবং চিন্তার গতি বেড়ে গেছে, কেউ কারো থেকে পিছিয়ে নেই, মনোভাব এরকম যেন আমরা সবাই রাজা! সত্যিই আমরা সবাই রাজা। কিন্তু এই যে রাজা, সে কি রাজ্যহীন, নাকি তার রাজ্য আছে? কারণ রাজ্যহীন রাজার কোন মূল্য থাকে না। দুনিয়াতে বসে যার অন্তরে মহান আল্লাহর বাসস্থান পাকাপোক্ত হয়েছে, তার ধন-সম্পদ না থাকলেও মনেপ্রাণে সে-ই প্রকৃত রাজা। এই জগৎ-সংসারে তার কোন কিছুর অভাব থাকে না, এমন কি মৃত্যুর পরেও তার রাজ্য এবং রাজত্ব দুটোই বহাল থাকে। কিন্তু জীবন-যাপনের মানোন্নয়ন এবং চলা ফেরার গতি দিনে দিনে এতই বেড়ে চলছে যে, শত ব্যস্ততার মধ্যে পরকালের হিসাব-নিকাশের চিন্তা থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি আমরা, আর যেতে যেতে বলছিÑ ‘ভাগ্যে যা আছে তা-ই হবে, এ নিয়ে বাড়তি টেনশনের কী আছে?’ এমন কথা হয়তো গায়ের জোরে বলছি। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করে না, তার ভাগ্য আমি আল্লাহ পরিবর্তন করি না’। এ বাণী দ্বারা বোঝা যায় যে, বর্তমানের কোন মূল নেই, যদি বর্তমান থেকে পরকালের জন্য নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য পুণ্য-আমল পুঁজি না করি।

দিন-দিন বিশ্বপ্রকৃতি যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, তাতে জন-জীবন কী রকম বিপর্যস্ত হচ্ছে, তা আমরা দেখতে এবং অনুভব করতে পারছি। তাছাড়া এখন অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি সমৃদ্ধ মিডিয়ার যুগ, এখন কোথায় কী ঘটছে, তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। এমতাবস্থায় যদি হঠাৎ এমন দেখা যায় ভোর হয়েছে ঠিক, তবু সূর্য উঠছে না! চরাচর ঘন অন্ধকারে ঢাকা। ঘড়ির কাটা ঘুরে সময় বাড়ছে, তবু সূর্যের দেখা নেই! তাহলে অবস্থা কেমন ভয়ঙ্কর হতে পারে? এ হয়তো কথার কথা, কিন্তু পৃথিবীর মত আলো আঁধারীর গুরুত্ব আমাদের দেহের ভিতরেও আছে। আসমান ও জমিনসহ যা কিছু আছে, এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি রয়েছে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে। সেখানেও একটা পাওয়ার হাউজ (কল্ব) আছে, এই পাওয়ার হাউজ বা কল্বই হল দেহরাজ্যে আলো উৎপাদনের একমাত্র ‘পাওয়ার গ্রিড’ বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এই শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে গঠিত যে রাজ্য, সে রাজ্যের যিনি একমাত্র বাসিন্দা, তিনি তো পর কেউ নন, পরমকরুণাময় আল্লাহতায়ালা নিজেই। হয়তো তাই, মানুষ সৃষ্টির পাশাপাশি মানুষের অন্তর-বাড়িকে প্রফুল্ল রাখার জন্য বিশ্ব প্রকৃতির মাঝে নজরকাড়া মনোরম দৃশ্য এবং নানান ফুলের অপার সৌন্দর্য দিয়েছেন। আবার দিনের আকাশে টকটকে লাল তপ্ত সূর্য, রাতের আকাশে অগণিত তারার মেলায় মনোমুগ্ধকর রূপালি চাঁদের কোমলতা। সুন্দর পরিচ্ছন্ন জীবন-যাপনে যা কিছু প্রয়োজন, এর সবই সৃষ্টি করেছেন তিনি। জীবনমান উন্নত করার জন্য বিভিন্ন মানের মেধা ও বুদ্ধি দান করেছেন। যিনি আঠারো হাজার মাখ্লুক সৃষ্টি করলেন, তাঁর জন্য কি আমাদের কোনই করণীয় নেই? প্রায়ই কথা প্রসঙ্গে অনেক পরিচিত, বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মী ভাইয়েরা বলে থাকেন, আল্লাহ যদি সবখানে বিরাজমান হন, তাহলে তিনি আমার মধ্যেও আছেন’। আমি তখন তাদের বলতে চেষ্টা করি, হ্যাঁ, সবার মধ্যে আছেন এ কথা ঠিক এবং তা আমরা জানি। কিন্তু আলোতে আছেন? না অন্ধকারে আছেন? সে খবর ক’জনে রাখি! আল্লাহতায়ালা নিজেই বলেছেন যে, তিনি মুমিনের অন্তরে অবস্থান করেন। কারণ মুমিনের অন্তর সব রকম হিংসা-অহঙ্কার ও কলুষতামুক্ত আয়নার মত স্বচ্ছ-পরিস্কার, আলোকিত। আর তাই, মুমিনের অন্তরের ঘরেই তো আল্লাহতায়ালা বাস করবেন।
পবিত্র কোরআনের সত্যবাণী অনুসারে পৃথিবীতে মানুষই হলো আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। এখন যদি বলি, আমরা মানুষ হিসেবে সবাই-ই আল্লাহর প্রতিনিধি, এ কথা এক অর্থে ঠিক, কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী একই স্থানের প্রতিনিধি যেমন হন না, তেমনি আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি সকল মানুষই আল্লাহর প্রতিনিধি হতে পারে না। এই পৃথিবী নামক গ্রহটিও আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি এক মহা প্রতিষ্ঠান, কালে কালে এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হয়েছেন অসংখ্য নবী-রাসুলগণ। এঁদের মধ্যে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর পর নবুওত বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পবিত্র কোরআন-হাদিসের সত্য বাণী অনুসারে কিয়ামত পর্যন্ত যুগে যুগে শ্রেষ্ঠ হাদি বা সংস্কার হয়ে আসতে থাকবেন বেলায়েতে-মাশায়েখগণ এবং তাঁরাই হবেন “আহলে বয়েত”এর অর্ন্তভুক্ত। পবিত্র কোরআনে এ রকম কামেল-মানুষের কাছে যাওয়ার কথা এবং তাঁদেরকে অনুসরণ করার নির্দেশ করেছেন এবং তাঁদের দেয়া অজিফা-আমল, দিক-নির্দেশনা বিশ্বাসের সঙ্গে মেনে চলতে চলতে, কলবের জিকির করতে করতে, যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করবেন, তার মৃত্যুই হবে আল্লাহতায়ালার কাছে অতি পছন্দনীয় এবং তিনিই হবেন মহান আল্লাহর কাছে প্রকৃত আত্মসমর্পণকারী।

আমার দীক্ষাগুরু কামেল মুর্শিদ খাজাবাবা কুতুববাগী কেবলাজানের শিষ্য হবার আগ পর্যন্ত জানা ছিল না যে, আল্লাহতায়ালার বাণীÑ ‘কূল্লু-নাফসিন জাইকাতুল মাউত’। অর্থ: প্রতিটি নফ্স’কেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে’। দরদী মুর্শিদকেবলাজানের কাছে জেনেছিÑ চিরসত্য এ বাণী ‘আত্মার মরণ নেই, আত্মা অবিনশ্বর’। মানুষ মরে না, মানুষের নফস’ মরে। সাধারণ মানুষ শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মরণশীল নফ্সকে বাঁচাতে দিন-রাত খেটে মরছি। আমার পীরকেবলাজান ভক্ত-আশেক-জাকেরানদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় তরিকতের আলোচনায় প্রসঙ্গ এলেই বলেনÑ ‘দুনিয়াদারী সব ভূতের বেগার, আসল কাজ হলো আল্লাহকে চেনা-জানা এবং তাঁকে রাজি-খুশি করানো’। এ কথা কি একবারও মনে পড়ে? যে নফ্সকে বাঁচাতে মরণপণ লড়াই করছি, সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে কতই টালবাহানার অবতারণায় লিপ্ত। অথচ চরম সত্য হচ্ছে, এ নফ্সই আমাদের আত্মাকে অন্ধকারে রাখার সব ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। যে আত্মা হল নিজের পরিচয়। আল্লাহকে চেনা বা দেখার একমাত্র আয়না, আসল ঠিকানা। জীবাত্মার মধ্যেই পরম আত্মার পরিচয়, যে পরিচয়ে আমরা পেয়েছি মানব জনম।

প্রিয় পাঠক ভাই-বোন ও বন্ধুগণ, আত্মার ঘরে বাতি না জ্বেলে, শুধু নিজের চলাচলের জায়গা আলোকিত রাখলেই কি চলবে? দেহ রাজ্যের ভিতরে যে ঘর আল্লাহর, সে ঘরে আলো জ্বালতে না পারলে আল্লাহকে দেখা যাবে না। আর তাঁকে দেখতে না পারলে ‘আত্মসমর্পণ বা প্রকৃত মুমিন মুসলমান হওয়া যাবে না। আমার তাই মনে হয় আত্মার ঘরের আলোই শক্তি এবং সে আলোতেই কল্যাণ ও মুক্তি। এই নাগরিক জীবনে সামান্য লোডশেডিং হলে যন্ত্রণার শেষ থাকে না। দুনিয়ার ঘরে বিদ্যুৎ থাক বা না থাক এ লেখার বিষয় তা নয়, তবে দেহের ঘরে যে আলো জ্বালতে হবে, তা জ্ঞানের। যে আলোয় পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার দেখা হয়, সে আলো গোপন চোখের দৃষ্টি মেলে দেখতে হয়। কাল্বের ঘরে আলো জ্বালাতে আর তার মুখে আল্লাহ আল্লাহ জিকির জারি করতে না পারলে মানবজনম ব্যর্থ। পৃথিবী নামক এ খেলাঘর থেকে কোন সঞ্চয় ছাড়া শূণ্য হাতে যেতে হবে অজানা দেশে, অচেনার কাছে। এখন যাঁর কাছে যাচ্ছি তাকে যদি না চিনি, না জানি তাহলে তাঁর সঙ্গে দেখা হবে কীভাবে? পীরকেবলাজানের পবিত্র জবানে বলতে শুনেছিÑ ‘আল্লাহতায়ালা তালাশি বান্দার দিলের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকেন’। তাহলে নিশ্চয়ই দিলের মধ্যে ঘর-বাড়ি আছে, নইলে ঘর ছাড়া জানালা হয় কিভাবে? যেহেতু ঘর আছে, সে ঘরে আলোও জ্বালাতে হয়। এ আলো চাঁদ-সূর্যের নয়, আল্লাহতায়ালার সিফাতি নূর। কারণ, সেখানে ‘দিলের ঘরে’ স্বয়ং আল্লাহতায়ালার বসবাস। যার অন্তর-দিল হিংসামুক্ত-আলোকিত, আল্লাহতায়ালা তাঁর ঘরেই বাস করবেন। কুতুববাগ দরবার শরীফ আত্মশুদ্ধির শিক্ষালয়। এ শিক্ষালয়ে ভর্তি হয়ে বুঝতে পেরেছি, শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফত এই চারটি বিষয়ের একত্র আমল ছাড়া, শুধু শরিয়তের আমল দিয়ে কখনোই দিলের ঘরে আলো জ্বালানো সম্ভব নয়। যেখানে একাধিক বিষয়ের গুরুত্ব অপরিহার্য্য সেখানে দু’একটি দিয়ে তা পূর্ণতা পায় না। তেমনি এ চারটির সমন্বয়ের অভাবে আত্মার ঘর থেকে যায় কঠিন পাপ-পঙ্কিলতায় ঘেরা অন্ধকারে। হে আল্লাহ! আমাদের আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সবসময় আপনাকে দেখার দৃষ্টি দান করুন।

(Visited 579 times, 1 visits today)
Share