কামেল পীর চেনার উপায়

আলহাজ মাওলানা হযরত সৈয়দ জাকির শাহ্ নকশবন্দি মোজাদ্দেদি কুতুববাগী

হাদিস: হুমুল্লাজিনা ইযা-রুয়ু ওয়া উয-কুরুল্লাহা “যাহাকে দেখিলে আল্লাহতায়ালার কথা স্মরণ হয়, মনে ভয় আসে এবং ইবাদত বন্দেগীতে মন বসে, সে-ই প্রকৃত কামেল মুর্শিদ, আউলিয়া বা আল্লাহতায়ালার খাসবান্দা ”

হযরত মাওলানা খলিলুর রহমান সাহেব শামছুল আরেফিনেতে লিখিয়াছেন- ইহা সকল লোকের জন্য নহে। যাহাদের ভিতর আল্লাহর জিকির জারি নাই অর্থাৎ যাহাদের দিলে আল্লাহ আল্লাহ জিকির হয় না, তাহারা বুঝিতে পারিবে না। আর যাহাদের দিলে গাফলত (অলসতা) দূর হইয়াছে অর্থাৎ, আত্মা জিন্দা হইয়াছে তাহারাই কামেল মুর্শিদ বুঝিতে বা চিনিতে সক্ষম।

আরও একটি কারণ এই যে, যাহাদের ভিতর দশগাছ রশি উত্তম ও এশকের মাদ্দা যাহাদের ভিতর বেশি, তাহারা যদি কোন অলিয়ে কামেলের প্রতি মহব্বতের নজরে দেখে, কোরআন-হাদিসের কথা শোনে, তবে অনেক সময় নবীর নূরে নবুয়তের তাছির বা অলিয়ে কামেলের দিলের ফয়েজ ওই ব্যক্তিদের দিলে পতিত হয় এবং দিলের ভিতর তাছির হইয়া পড়ে, তখন তাহাদের মন ওই দিকে ঝুকিয়া পড়ে। যাহাদের ওই দশগাছ রশি সবই খারাপ তাহাদের ভিতরে এশকের মাদ্দা থাকে না। কাজেই তাহাদিগকে অলিরা যদি হাজারও বুঝায় বা উপদেশ দেয় ও কোরআন-হাদিসের কথা হাজারও শোনে তবুও তাহাদের ভিতর তাছির হয় না।

ইহাই ঠিক কথা, কারণ রসুল পাক (সঃ)-এর হুজুরে যে আসিত, তাহাদের দিল মহব্বতে গলিয়া যাইত এবং সাথে সাথে সে মুসলামন হইয়া যাইত। কিন্তু আবু জাহেল ও আবু লাহাব প্রমুখ কাফেরগণ কখনও রসুলুল্লাহর গুণ বুঝিতে পারে নাই। এ জামানার লোকের অবস্থাও তদ্রুপ হইবে। পীরকামেলের নাম শুনিয়া কত লোক ফয়েজে বে-এখতিয়ার (অস্থির) হইয়া যায়, আবার এমন লোকও আছে, যাহারা কামেল লোকের চেহারা দেখিয়াও তাহাকে বিশ্বাস করে না ও তাহাকে শত-সহস্রবার বুঝাইলেও বুঝ নেয় না। জাকের সকল সহজেই বুঝিতে পারে যে, মিথ্যা কথা বলিলে, হারাম খাদ্য আহার করিলে বা অন্যান্য পাপের কাজ করিলে দিল বন্ধ অর্থাৎ, আল্লাহর জিকির বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়া যায় এবং ফয়েজ বন্ধ হইয়া যায়। আর যে সমস্ত লোক আজীবন হারাম খাদ্য আহার করিয়া বা নানা প্রকার গুনাহর কাজ করিয়া দিল কঠিন করিয়া ফেলিয়াছে, তাহারা কি প্রকারে মুর্শিদে কামেল চিনিতে পারিবে?

যিনি কামেল মোকাম্মেল পীর হইবেন, শরিয়ত ও মারেফতের পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকিতে হইবে। কমপক্ষে শরিয়তের বিধানসমূহ ভালরূপে জানা থাকিবে এবং এলমে লাদুন্নাতে তাঁর পূর্ণ অধিকার থাকিবে। শরিয়তের আদেশ নিষেধ পালন ও তদনুযায়ী কাজ করিবেন। শরিয়ত বিরোধী কাজ হইতে দূরে থাকিবেন। খোদাতায়ালাকে ভয় করিবেন ও মুত্তাকী হইবেন এবং পরহেজগার হইবেন।

কামেল বা মোকাম্মেল পীরের ভিতর এই তিনটি গুণ থাকা একান্ত আবশ্যক। পীরের নিকট হইতে ছবকসমূহ আয়ত্ত করা, ফয়েজ হাসিল করা ও মুরিদদের ভিতর ফয়েজ পৌঁছানোর ক্ষমতা থাকা। যিনি কামেল হইবেন তিনি লোভ শূন্য হইবেন। কেন না লোভী ব্যক্তি কখনও ফকির হইতে পারে না।

‘কওলোল জামিল’ কিতাবে আছে, অনেকে মনে করে থাকেন যে, বার মাস রোজা রাখিতে হইবে, স্ত্রী হইতে দূরে থাকিতে হইবে, খানা খাইবে না ও জঙ্গলবাসী হইতে হইবে আসলেই এই সব শর্ত নহে। রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর জামানায় যেমন অজদ, গোলবা, ছুকুর ও বেখোদী ইত্যাদি নানা প্রকার জজ্‌বা ছিল, কামেল পীরের মুরিদানের মধ্যেও রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর জামানার ন্যায় মাঝে মাঝে দুই এক জনের ওই সকল হালত হইবে। কেন না আউলিয়াগণ রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণ পাইয়া থাকেন। আহ্ইয়া উলুমউদ্দিন কিতাবের দ্বিতীয় খন্ডে অজদের বয়ান দেখুন যে, আসহাবগণের কিরূপ অজদ হইয়াছিল। এই জামানার মুমিনগণের তাহাদের চেয়ে (১) ছবুরের শক্তি শত শত গুণে কম। কাজেই এ জামানার জিকিরকারীগণের তাহাদের চেয়ে শত শত গুণে বেশি বেকারার (অস্থির) হওয়ার কথা।

বর্তমানে ভন্ড পীর হইতে রক্ষা পাওয়া বড়ই কঠিন হইয়া দাঁড়াইয়াছে। কারণ, একদল নামধারী পীর আছে, তারা ‘আমেল সিফলি’ আমলিয়াতের সাহায্যে জিন-পরী আবদ্ধ করিয়া ও কিছু বইপুস্তক পড়িয়া, পানি পড়া, তাবিজ-কবজ, ঝাড়ফুঁক ও কুফরি কাজের দ্বারা যাদু-টোনা-বান করিয়া উহার সাহায্যে জনসাধারণের (অশিক্ষিত মূর্খ লোকের) নিকট ছদ্মবেশী পীর সাজিয়া রুজির পথ করিয়া থাকে। আর ভিতরে ভিতরে নানা প্রকার পৈশাচিক কার্য করিয়া থাকে। আর বলিয়া বেড়ায়, রোজা নামাজ কিছু না, এই সকল ইবাদতের কোন আবশ্যক নাই। আমার নিকট মুরিদ হইলে এই সকল ইবাদত করা লাগবে না। এবং এ সম্বন্ধে নানা প্রকার কুতর্ক করিয়া থাকে। ইবাদতের দায় হইতে রক্ষা পাওয়া যাইবে ভাবিয়া, অনেক জাহেল অশিক্ষিত লোক তাহাদের মুরিদ হইয়া থাকে। কেবল গানবাদ্য, গাজা, নেশা তাহাদের ইবাদত মনে করে থাকে। বে-শরা লোকদিগকে কখনও কামেল বলিয়া বিশ্বাস করিতে নাই। তীর যেমন ধনুক হইতে যত দ্রুত চলে যায়, তার চেয়েও দ্রুত চলে যাওয়া একান্ত আবশ্যক। কিতাবে আছে, কেহ যদি বাতাসের ওপর দিয়া উড়িয়া যায়, অগ্নির ভিতরে বসিয়া থাকে বা পানির উপর দিয়া হাঁটিয়া যায়, আর যদি সর্বদা সে শরিয়তের (১) খেলাফ কার্য করে তবুও তাহাকে বিশ্বাস করিও না। বর্তমানে আর একদল আলেম ও মৌলভী আছে, তাহারা কয়েক বছর মাদ্রাসায় পড়িয়া রুজির কোন পথ খুঁজিয়া না পাইয়া, অবশেষে কোন রাস্তা গতি না পাইয়া, একটা ঘর ভাড়া করে খানকা শরীফ নাম দিয়া, তাসাউফের দুই একটি কথা শিক্ষা নিয়া পীর সাজিয়া থাকে এবং পাগড়ি জোব্বা পড়ে বেশভুসা পড়িয়া বলিয়া বেড়ায়, আমি কামেল মুর্শিদ, কামেলপীর। কোন স্থানে কামেলপীরের মুরিদের মদ্যে অজদ, গোলবা, ছুকুর ও বেখোদী ইত্যাদি হালতের লোক দেখিলে নানা রকম ঠাট্টা ও বদনাম করিয়া থাকে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তাহারা পীর-মুরিদীর কিছুই জানে না। কেন না পূর্বেই বলা হইয়াছে, একদল পীর আছে, তাহারা পীরের নিকট গিয়া দুই একটি ছবক নিয়া পীরের এজাজত ছাড়াই ও পীরের খেলাফত ছাড়াই পীর সাজিয়া মুরিদ বানাইতেছে। তাহাদের শিক্ষায় ফয়েজ নাই, মুরিদের দিল জিন্দা নাই, অজদ, গোলবা ছুকুর ইত্যাদি মূল জিনিস কিছুই নাই কারণ, তাহাদের তাওয়াজ্জোহ দেওয়ার ক্ষমতা নাই। কেন না, পীরের বিনা হুকুমে ও বিনা খেলাফতে পীর সাজিয়াছে। স্বামী ছাড়া যেমন স্ত্রীর সন্তান আসে না, তেমনি কামেল মুর্শিদের পায়রুবি ছাড়া কামেল পীর হইতে পারে না।

বর্তমান সময়ে আর একদল পীর দেখিতে পাওয়া যায়, তারা শরিয়তী পীর দাবী করিয়া থাকে। তাহাদের ভিতর জাহেরাতে শরিয়তের কোনপ্রকার ত্রুটি দেখা যায় না। ফেটা পাগড়ি জোব্বা সবই আছে মূলত তাদের এলমে লাদুন্না বা মারেফতের জ্ঞান নাই, তারা জানে না যে ইমাম মালেক বলেন- যে শুধু শরিয়ত করে সে ফাসেক, আর যে শুধু মারেফত করে সে জিন্দিক বা কাফের। তাহারাই পীর-মুরিদ করিয়া আসিতেছে। মোট কথা জাহেরাতে তাহাদের ভিতর শরিয়তের বা পীর মুরিদীর কোনপ্রকার ত্রুটি দেখা যায় না। কিন্তু কামেল পীরদের মুরিদের মধ্যে যে সকল বুঝ খুলিয়া যায়, তাহাদের মুরিদের ভিতর সে সব কিছুই নাই। তাহাদের মুরিদেরা এই মাত্র বুঝে যে, দোয়া দরূদ শিক্ষা করা এবং জাহেরা-শরিয়ত মত চলা, এই বুঝি আল্লাহ পাওয়ার পথ, এই পর্যন্ত মারেফাতের সীমা। তাহাদের শিক্ষায় মুরিদের দিল জিন্দা হয় না। তাহাদের মুরিদের ফয়েজ সম্বন্ধে জ্ঞান নাই অজদ ও গোলবা ইত্যাদি প্রায় চল্লিশ প্রকার জজ্‌বা আছে, কিন্তু তাহাদের মুরিদগণের কোনপ্রকার জজ্‌বা সম্বন্ধে জ্ঞান নাই।

রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর (মিয়াণে আশেখ ও মাশুক রমজিস্ত কেরামিন কাতেবীনরা খবর নিস্ত) জামানায় যে সাহাবাদের প্রায় চল্লিশ প্রকার জজ্‌বা ছিল, তাহাও তাহারা স্বীকার করিতে চাহে না। এমন কি যদি কোন কামেল পীরের মুরিদের ভিতর দুই একজনের জজ্‌বা দেখে, তবে তাহাদিগকে ঠাট্টা করিয়া বেড়ায়, আর বলে ইহারা বে-শরা কাজ করিয়া থাকে। ইহারা শরিয়ত মত চলে না। কেহ কেহ নানা প্রকার অকথ্য ভাষায় গালিও দিয়া থাকে। আর গর্ব করিয়া থাকে, আমরা শরিয়তী পীর ধরিয়াছি, আমাদের কাহারও এই প্রকার হয় না।
দুঃখের বিষয় এই যে, পীরসাহেবও রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর জামানার কথা ভুলিয়া যান এবং বলিয়া থাকেন রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর জামানায় এ সব জজ্‌বা ছিল না। কিন্তু বর্তমান আক্ষেপের বিষয় রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সময় যে জজ্‌বা বহুগুণে বেশি ছিল তাহা পীরসাহেবেরও জানা নাই। অনেক পীরসাহেব জজ্‌বা সম্বন্ধীয় কিতাবাদী পড়েন-ই নাই, আর কোন পীরসাহেব আছে, তাহাদের মুরিদের ভিতর ওই সকল হালত বা জজ্‌বা নাই বলিয়া রসুলুল্লাহর জামানার সাহাবিদের জজ্‌বার বিষয় ধামাচাপা দিয়া আসিতেছে। মোট কথা যে সকল পীরেরা জজ্‌বা চিনে না বা যে সকল পীরের মুরিদের মধ্যে জজ্‌বা মোটেই দেখিতে পাওয়া যায় না, তাহাদের হইতে দূরে থাকা কতর্ব্য, কেন না তাহারা নাকেচ পীর ও বাতিল পীর।

(Visited 478 times, 1 visits today)
Share