মহিমান্বিত লাইলাতুল কদরের ফজিলত ও মর্যাদা

আলহাজ মাওলানা হযরত সৈয়দ জাকির শাহ নকশবন্দি মোজাদ্দেদি কুতুববাগী

হযরত মা আয়েশা (রাঃ) রাসুল (সঃ) কে একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, হে রাসুলুল্লাহ! (সঃ) আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তখন কী করবো? উত্তরে আল্লাহর হাবীব বললেন, ‘তুমি বলবে, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুব্বুন তুহিব্বুল আফ্ওয়া ফা’ফু আন্নি’, অর্থ্যাৎ হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করে দিতে ভালোবাসেন। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন।’ (তিরমিজি শরীফ)রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস পবিত্র মাহে রমজান। এরই মধ্যে নিহিত রয়েছে হাজার রজনীর গর্বিত এক লাইলাতুল কদর। মহিমান্বিত এ রজনী অতি বরকতময় কারণ, এই রাতের শ্রেষ্ঠত্ব, মাহাত্ম্য ও মর্যাদা সবচেয়ে বড় এবং এর বৈশিষ্ট্য হলো কুলকায়েনাতের রহমতের কান্ডারী আখেরী নবী রাসুলুল্লাহর (সঃ) এর ওপর পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। বনী ইসরাইলের শামউল নামক এক ‘আবিদ-জাহিদ’ ব্যক্তির কঠোর সাধনা সম্পর্কে রাসুল (সঃ) উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামদের সম্মুখে বলছিলেন, ‘সেই মহৎ ব্যক্তি এক হাজার মাস লাগাতার দিবাভাগে সিয়াম ও জিহাদরত থাকতেন এবং সারারাত জেগে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন।’ নবী (সঃ) এর জবান মোবারকে সাহাবীগণ এমন কঠোর সাধক ও নেককার মুমিন ব্যক্তির কথা শুনে বলতে লাগলেন, হায়! আমরাও যদি এ লোকটির মত দীর্ঘায়ু পেতাম তাহলে আমরাও ওই রকম দিন-রাত্রি ইবাদত-বন্দেগী করে কাটিয়ে দিতাম। ঠিক এমন সময়ই ‘সুরা কদর’ রাসুল (সঃ) এর ওপর নাজিল হয়, ‘নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) অবিতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জানো? কদরের রাত সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয়, প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি বিরাজ করে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। (সুরা আল কদর, আয়াত ১-৫)

বোখারী শরীফে বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সহিত সওয়াব হাসিলের উদ্দেশ্যে কদরের রাতে দন্ডায়মান হয়, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।’ এবং রাসুল (সঃ) রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন আর বলতেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশ রাতে শবে কদর অনুসন্ধান করো।’ আল্লাহর নিগুঢ় ভেদের কারণেই রাসুলুল্লাহ (সঃ) এই রজনীর হাকিকত প্রকাশ না করে শুধু ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, পথিমধ্যে অমুক, অমুক, কদরের নির্ধারিত রাতের বর্ণনা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। তোমরা ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকো এবং তা মিটিয়ে নাও। আর রমজানের শেষ দশভাগের বে-জোড় সংখ্যার রাতগুলোতে ‘শবে কদর’ সন্ধান করো!’ (বুখারী ও মুসলিম শরীফ) সুতরাং অতি বরকতপূর্ণ এ রাতে নফল নামাজ, জিকির-আসকার, ধ্যান-মোরাকাবা-মোশাহাদা, কোরআন তিলওয়াতের মধ্য দিয়ে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করলে জীবন ও আখিরাতের মঙ্গল হয়। রাসুল (সঃ) বলেন, ‘সিজদায়, বান্দা তার প্রভুর নিকটবর্তী হয়ে থাকে, তাই তোমরা অধিক দোয়া করো।’ (মুসলিম শরীফ) শবে কদরের যাবতীয় ইবাদতের প্রতি ইঙ্গিত করে এই রাতের অপার বৈশিষ্ট সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘হা-মীম! শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) এক মুবারকময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করা হয়।’ (সুরা আদ-দুখান, আয়াত ১-৪) এসময় আল্লাহতায়ালার খাস রহমত অজস্র ধারায় বর্ষিত হয় এবং হযরত জিব্রাঈল (আঃ) অসংখ্য ফেরেশতা নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করে। আর সকাল না হওয়া পর্যন্ত নামাজ ও জিকিরে ইবাদতরত বান্দাদের নাজাতের জন্য দোয়া করতে থাকেন।

শবে কদরে চার ধরণের মানুষের প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না, এরা হলেন মদপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি, বাবা- মায়ের অবাধ্য সন্তান, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং হিংসা-পোষণকারীর ও সম্পর্ক ছিন্নকারী। তাদের কোন কিছুই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না, যতক্ষণ না তারা এসব অপকর্ম থেকে সংশোধন হবে।’ (শুয়াবুল ঈমান, ৩য় খন্ড) মহিমান্বিত এরজনীকে মহান আল্লাহতায়ালা নিজেই হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে ঘোষণা করেছেন। এ অমূল্য রাতকে যে ব্যক্তি কাজে লাগাতে পারলো না, রাসুল (সঃ) তাকে হতভাগা বলেছেন। এও বলেছেন যে, উম্মতগণ যদি চায় তবে এ রাতকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে। এ রাতের প্রত্যেকটি আমল মহান আল্লাহর কাছে গৃহিত হয়, কেবল চার শ্রেণির ব্যক্তি ছাড়া।

লাইলাতুল কদর পরবর্তী এক বছরে বান্দার সকল বিধিলিপি করে নির্ধারিত ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং এই বিধিলিপিতে মানুষের জীবন-মৃত্যু, রিযিক, বৃষ্টি ইত্যাদির পরিমানও উল্ল্যেখ করা থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত চারজন প্রধান ফেরেশতা যথাক্রমেঃ হযরত ইসরাফিল (আঃ), হযরত মিকাইল (আঃ), হযরত আজরাইল (আঃ) ও হযরত জিবরাইল (আঃ)।’ (তাফসীরে মারেফুল কোরআন) তাফসীরে রুহুল বয়ানে উল্ল্যেখ আছে, ‘হযরত ইসমাইল মক্কী (রঃ) উদ্ধৃত করেছেন, বুজুর্গানে দ্বীনগণ শেষ দশ দিনের বেজোড় তারগুলোতে শবে কদরের নিয়তে তারা নফল নামাজ পড়তেন।’ হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সঃ) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি শবে কদরের নিয়তে নফল নামাজে দন্ডায়মান থাকে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায় (সহিহ বুখারী ও মুসলিম শরীফ)। শবে কদরের রাতে নফল নামাজের গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম। অন্য এক হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে আত্মসমর্পিত হৃদয় নিয়ে একাগ্রচিত্তে ইবাদতে কাটাবে, মহান আল্লাহ তার ইজ্জত ও মর্যাদা বহুগুণে বাড়িয়ে দিবেন।’ তাই লাইলাতুল কদরে যে ব্যক্তি আল্লাহর আরাধনায় মশগুল থাকবে তার ওপর থেকে দোজখের আজাব হারাম করে দেওয়া হবে। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ‘সমস্ত রজনী আল্লাহতায়ালা লাইলাতুল কদর দ্বারাই সৌন্দর্যময় ও মোহনীয় করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা বরকতপূর্ণ এ রজনীতে বেশি বেশি জিকির করো। রাসুলুল্লাহ আরোও বলেন, ‘তোমরা তোমাদের কবরকে আলোকিত পেতে চাইলে কদরের রাত ইবাদতে কাটিয়ে দাও। পবিত্র মাহে রমজানের পুণ্যময় এ রজনী বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহতায়ালার অশেষ রহমত, বরকত ও ক্ষমা লাভের এক অপূর্ব সুযোগ। মহিমান্বিত এ রজনীতে উচিত নিজেকে পরিচ্ছন্ন রেখে ফরজ নামাজ আদায় করা তার সাথে সুন্নত নামাজসহ কোরআন তিলওয়াত করা। দোয়ার মাহফিলে শামিল হওয়া। বেশি বেশি দরূদ পাঠ করা। রাতে না ঘুমিয়ে জিকির-আসকার করা, ধ্যান-মোরাকাবা করা, বেশি বেশি দান-সদকা দেয়া ও ভুখা বা অনাহারীকে খাবার খাওয়ানো। এমন আরোও যত ভালো কাজ আছে সেগুলো করা।

(Visited 107 times, 1 visits today)
Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *