মহররম মাসের তাৎপর্য

আলহাজ মাওলানা হযরত সৈয়দ জাকির শাহ্ নকশবন্দি মোজাদ্দেদি কুতুববাগী

আরবি হিজরী সনের প্রথম মাস ‘মহররম’। মহররম মাসে আল্লাহর সৃষ্টিজগতে বহু উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে। তার মধ্যে ১০টি ঘটনা উল্লেখযোগ্য এই ১০টির মধ্যে একটি হচ্ছে ‘আশুরা’ এই ১০ মহররম ইসলাম ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা।
* আল্লাহপাক এই দিনে লওহে মাহফুজ ও প্রাণীকূলের প্রাণ সৃষ্টি করেছেন।
* দুনিয়ার সমস্ত সমুদ্র-মহাসমুদ্র এবং পাহাড় পর্বত এই মহররম মাসের দশ তারিখে সৃষ্টি করা হয়েছে।
* হযরত আদম (আঃ)-কে আল্লাহপাক মহররমের দশ তারিখে সৃষ্টি করে বেহেশতে প্রবেশ করাইয়াছেন।
* হযরত রসুল (সঃ)-এর পূর্ব পুরুষ হযরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ (আঃ)-কে আল্লাহপাক মহররমের দশ তারিখে দুনিয়াতে পাঠাইয়াছেন।
* এই মহররমের দশ তারিখে পুত্র হযরত ঈসমাইল (আঃ)-কে আল্লাহর হুকুমে কোরবানী করার হুকুম করা হয়েছিল।
* হযরত আদম (আঃ) বেহেশত হতে দুনিয়াতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর, এই মহরমের দশ তারিখে আল্লাহতায়ালা তার তওবা কবুল করেন।
* ফেরাউন হযরত মুসা (আঃ)-এর পিছনে আক্রমণ করতে যাইয়া নীলনদে ডুবে প্রাণ হারিয়েছিল এই মহররমের দশ তারিখে।
* হযরত ঈসা (আঃ) দুনিয়ায় আগমন করেছিলেন এই দশ মহররমে দিনটিতে।
* এই দশ মহররমে হযরত রসুল (সঃ)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) কারবালার প্রান্তরে পরিবার-পরিজন ও সঙ্গী-সাথী মোট ৭২ জন শহিদ হন।
* সর্বশেষ আল্লাহপাকের নির্দেশ অনুযায়ী মহররম মাসের দশ তারিখে হযরত ঈসরাফিল (আঃ) শিঙ্গায় ফুঁকে কেয়ামত ঘটাবেন।
এই মাসের দশ তারিখকে ইয়াওমে আশুরা বলা হয়।

এই মহররমের দশ তারিখে ইয়াজিদের হুকুমে ৭২ জন ইমাম বংশের আওলাদগণকে নির্মমভাবে শহীদ করেছিলেন। এই ইয়াজিদের ব্যক্তিগত চরিত্র ছিল অনৈসলামিক, পাপাচারপূর্ণ, নিষ্ঠুর, বন্যস্বভাব, অমানুষ, অধার্মিক, স্বেচ্ছাচারী এবং মনুষ্যত্ব তার ভিতরে নাই। ইয়াজিদের রাজ্যে হালাল বলতে কিছুই ছিল না, সব কিছুর ভিতরে হারাম ছিল ও আল্লাহ বিরোধী ছিল। মদ, জুয়া, ঘুষ, দূর্নীতি, জেনা ব্যাভিচার ভাই-বোনদের মধ্যে বিয়ে-শাদী ইত্যাদি করাইতেন। এই সমস্ত আসামাজিক অনৈসলামিক গর্হিত কাজগুলো নিজে করে আনন্দিত হইতেন ও অন্যদেরকে করাইতেন বা করার জন্য উৎসাহিত করতেন।

এ সমস্ত কাজ বাস্তবায়ন করার জন্য ইয়েমেন অধিবাসী মুনাফেক আবদুল্লাহ ইবনে সাবার ছদ্মবেশী ইসলামী পোশাকধারী, সে একজন ইহুদীর সন্তান ছিল। এই মুনাফেক চৌদ্দজন বিশিষ্ট গুপ্তচর দল গঠন করেন। তিনি মুসলিম রূপে আবির্ভাব হওয়ার পর ইসলামের মূল শিকড় কাটার জন্য সর্বপ্রথম পরিকল্পনা ছিল, উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)-কে হত্যা করা ও অন্যান্য সাহাবিদেরসহ কোরআনের হাফেজদেরকে হত্যা করেছেন, যা এই অল্প লেখায় ‘আত্মার আলো’ পত্রিকায় লেখা সম্ভব হল না। কারবালায় ১০ মহররমে যে কুফাবাসী কুচক্রি ইয়াজিদের দল বাইয়াতের দাওয়াত দিয়ে ইমাম হোসাইন (রাঃ)-কে ষড়যন্ত্র করে নিয়ে যাওয়ার জন্য দাওয়াত করেন এবং হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) তাদের দাওয়াতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। কুফা শহরে যাবার সময় হোর নামক অনুতপ্তকারী কুফার পথে বাধা দিয়ে নিদারুন মরুপ্রান্তর কারবালার দিকে নিয়ে যান। ইমাম হোসাইন (রাঃ) জানতে পারেন তাঁর শত্রুদের পরিকল্পনা, আহলে বাইয়াত ইমাম বংশ নিপাতের পরিকল্পনা, নবী প্রেমিকদের আঘাতের পরিকল্পনা ও ক্ষমতা লোভের পরিকল্পনা। ইমাম হোসাইন (রাঃ) ইলমে লাদুন্না জ্ঞানের আধিকারী ছিলেন, তাই তিনি জানতে পারলেন ইয়াজিদ দল আমাকে কিছুক্ষণের মধ্যে শহীদ করিবেন।

ইমাম হোসাইন (রাঃ) তেনার পুত্র জয়নুল আবেদীনকে তন্দ্রা থেকে উঠাইয়া নিজের সিনা মোবারকে স্বজোরে চাপিয়া বা জড়াইয়া কিছু সময় ধরে রাখলেন এবং তাওয়াজ্জোহ্ এত্তেহাদি (রুহানী এলেম) প্রদান করলেন। তারপর ইমাম হোসাইন (রাঃ) আওলাদে রসুল আহলে বাইয়াত ও সঙ্গী-সাথীদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা আমার এই পুত্র ইমাম জয়নুল আবেদীনকে প্রাণভরে ভক্তির সাথে আদর যতœ করিবে। নানাজান নবী করিম (সঃ)-এর গুপ্তধন, আমার মা জগৎ জননী মা ফাতেমা, আমার বাবা হযরত আলী (রাঃ) এবং আমার ভাই হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) হইতে আমি লাভ করেছিলাম। তাই শহীদ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ইমাম জয়নুল আবেদীনের বুকে গচ্ছিত বা আমানত রেখে গেলাম। আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় ইমাম জয়নুল আবেদীন (রাঃ)-এর উছিলায় নবীজির এলমে বেলায়েত ‘রুহানী অনুশাসন’ সিনাবসিনা হয়ে কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়ায় জারি থাকিবে।

তারপর জয়নুল আবেদীনকে চুম্বন করে তাঁর ফুফু আম্মা জয়নব (রাঃ) কাছে তত্তাবধানে ছেড়ে দিলেন। নবীজির পর দুনিয়ায় আর কোন নবী আসবেন না, কিন্তু তাঁর এই বাতেনী বিদ্যা এলমে বেলায়েতের গুণে গুনান্বিত হয়ে নায়েবে নবীর (আউলিয়া কেরাম) আগমন ধারা কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। আর যাহারা আহলে বাইয়াতের আনুগত্য করল, তাহারা ইসলামের মধ্যে আছে। আর যাহারা আনুগত্য করল না, তাহারা ইসলাম হইতে খারিজ।

(Visited 170 times, 1 visits today)
Share