পিতা করে পুত্র জবাই এমন প্রেমের তুলনা নাই

 আলহাজ মাওলানা হযরত সৈয়দ জাকির শাহ নকশবন্দি মোজাদ্দেদি কুতুববাগী

ইসলাম ধর্মের অন্যতম বিধান হলো কোরবানি। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আমরা প্রতি বছর পশু কোরবানি করে থাকি। পবিত্র কোরআনের সূরা ছাফফাতে মহান আল্লাহতায়ালা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তাঁর প্রিয়পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর ঐতিহাসিক ঘটনা এভাবেই উল্লেখ করেছেন, ‘অতঃপর সে (ইসমাঈল) যখন পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইব্রাহীম তাকে বললো, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে জবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি? সে বলল, পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহীম (আঃ) তাকে জবেহ করার জন্য শায়িত করল, তখন আমি তাকে ডেকে বললাম : হে ইব্রাহীম, আপনি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালেন। আমি এভাবেই সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম জবেহ করার জন্য এক মহান জন্তু’ (সূরা ছাফফাত, আয়াত ১০২-১০৭)। হাদিসের বিভিন্ন কিতাবে কোরবানির ফজিলত সম্বলিত বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে, ‘রাসুল (সঃ) বলেছেন, ‘আদম সন্তান কোরবানির দিন যত নেক আমল করে, তার মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হচ্ছে, পশু কোরবানির মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত করা। কিয়ামতের দিন কোরবানির পশু (জীবিত হয়ে) তার শিং, খুর এবং পশম সহকারে উঠবে। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে গড়ানোর আগেই আল্লাহর দরবারে তা কবুল হয়ে যায়। বিখ্যাত হাদিস বিশারদ সাহাবী হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসুল (সঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থবান থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করলো না, সে যেন ঈদগাহের কাছেও না আসে’ (ইবনে মাজাহ)।

কোরবানির মূল ঘটনা থেকে এখানে সংক্ষেপে কিছুটা উল্লেখ করা হলো : যখন বাবা হযরত আদম ও মা হাওয়া (আঃ) পৃথিবীতে আগমন করেন এবং তাদের সন্তান প্রজনন ও বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন মা হাওয়া (আঃ)-এর প্রতি গর্ভ থেকে জোড়া জোড়া (যমজ) অর্থাৎ একসঙ্গে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করতেন। কেবল হযরত শীস (আঃ) ব্যতিরেকে। কারণ, তিনি একা ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। তখন ভাই-বোন ছাড়া হযরত আদম (আঃ)-এর আর কোন সন্তান ছিল না। অথচ ভাই-বোন পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। তাই আল্লাহতায়ালা উপস্থিত প্রয়োজনের খাতিরে হযরত আদম (আঃ)-এর শরিয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারিনী কন্যা সহোদরা বোন হিসেবে গণ্য হবে না। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ। সুতরাং সে সময় হযরত আদম (আঃ) একটি জোড়ার মেয়ের সঙ্গে অন্য জোড়ার ছেলের বিয়ে দিতেন। ঘটনাক্রমে কাবিলের সঙ্গে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিলেন তিনি ছিলেন পরমা সুন্দরী। তাঁর নাম আকলিমা। কিন্তু হাবিলের সঙ্গে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে দেখতে অতটা সুন্দরী ছিলেন না। তার নাম ছিল লিওজা। বিবাহের সময় হলে শরয়ী নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহোদরা বোন কাবিলের ভাগে পড়ল। কিন্তু কাবিল সে নিয়ম না মেনে তাঁর সহোদরা সুন্দরী আকলিমাকে বিয়ে করতে চাইলো। কিন্তু হযরত আদম (আঃ) আল্লাহর আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন এবং কাবিলকে তাঁর নির্দেশ মানতে বললেন। কিন্তু সে তা মানল না। এবার তিনি কাবিলকে বকাঝকা করলেন। তবুও কাবিল ঐ বকাঝকায় কান দিলেন না। অতঃপর হযরত আদম (আঃ) তাঁর এ দুই সন্তান হাবিল ও কাবিলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা উভয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি পেশ কর, যার কোরবানি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে, তার সঙ্গেই আকলিমার বিয়ে দেয়া হবে। সে সময় কোরবানি গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে সে কোরবানিকে ভষ্মীভূত করে  ফেলত। আর যার কোরবানি কবুল হতো না তারটা পড়ে থাকত। যা-হোক, তাদের কোরবানির পদ্ধতি সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো, কাবিল ছিল চাষী। তাই তিনি গমের শীষ থেকে ভালো ভালো গমের শীষ বের করে নিয়ে বাজে শীষগুলোর একটি আটি কোরবানির জন্য পেশ করল। আর হাবিল ছিল পশুপালনকারী। তাই সে তার জন্তুর মধ্যে থেকে সবচেয়ে সেরা একটি দুম্বা কোরবানির জন্য পেশ করল। এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবিলের কোরবানিটি ভষ্মীভূত করে দিল। আর কাবিলের কোরবানি যথাস্থানেই পড়ে থাকল। অর্থাৎ হাবিলের কোরবানিটি গৃহীত হলো আর কাবিলেরটি হলো না। কিন্তু কাবিল এ আসমানী সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারলেন না। এ অকৃতকার্যতায় কাবিলের দুঃখ ও ক্ষোভ আরো বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং প্রকাশ্যে তার ভাইকে বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করবো। হাবিল তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত ও নীতিগত বাক্য উচ্চারণ করলো, তিনি (আল্লাহ) মুত্তাক্বীর কর্মই গ্রহণ করেন। এ বাক্যে কাবিলের প্রতি হাবিলের সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা ফুটে উঠেছিল। (তাফসীর ইবনু কাসীর, দুররে মনসূর, ফতহুল বায়ান, ৩/৪৫ ও ফতহুল ক্বাদীর, ২/২৮-২৯)।

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হাবিল ও কাবিল কর্তৃক কোরবানির এ ঘটনা থেকেই মূলত কোরবানির ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে। তারপর থেকে বিগত সকল উম্মতের ওপরেই এ বিধান জারি ছিল। আল্লাহতায়ালা বলেনÑ ‘ওয়া লিকুল্লি উম্মাতিন জ্ব’আল্নাÑ মানসাকাল লিইয়ায্কুরুস্ মাল্ লা-হি আলা- মা- রায¦কাহুম মিম বাহীমাতিল আন্ আ-মি; ফাইলা-হুকুম ইলা-হুওঁ ওয়া-হ্বিদুন ফালাহূ- আসলিমূ ওয়া বাশ্শিরিল মুখ্বিতীন।’ অর্থ: আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কোরবানির বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা রিযিকস্বরূপ উক্ত চতুষ্পদ পশু জবেহ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে। এ জন্য যে, তোমাদের উপাস্য তো একমাত্র আল্লাহ, তাই তাঁরই আজ্ঞাধীন থাক’ (সূরা হজ, পারা-২২, আয়াত-৩৪)। ফতহুল ক্বাদীরের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হাবিলের পেশকৃত দুম্বাটি জান্নাতে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং তা জান্নাতে বিচরণ করতে থাকে। অবশেষে ঐ দুম্বাটি কোরবানির জন্য হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর কাছে পাঠিয়ে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে  বাচিয়ে দেওয়া হয়।

হযরত নূহ (আঃ)-এর যুগে প্রচলিত কোরবানির প্রথার উল্লেখ করে মিসরের প্রখ্যাত আলেম মুহাম্মদ ফরীদ ওয়াজদী ‘দায়েরাতুল মাআরিফ’ গ্রন্থে প্রমাণ সহকারে উল্লেখ করেছেন, ‘হযরত নূহ (আঃ) জন্তু জবেহ করার উদ্দেশ্যে একটি কোরবানগাহ (কোরবানি করার নির্দিষ্ট স্থান) নির্মাণ করেছিলেন। এবং তাতে জবেহকৃত জন্তু আগুন দ্বারা জ্বালিয়ে দিতেন। তারপর দুনিয়ার ইতিহাসে নজিরবিহীন কোরবানি পেশ করেছিলেন  হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এবং তাঁর সময় থেকেই কোরবানি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে প্রচলিত হতে থাকে।’ তাহলে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর কোরবানিই মহান আল্লাহর দরবারে ইবাদতে কবুল ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর সেই কোরবানির মাধ্যমে নজিরবিহীন ত্যাগ দুনিয়ার বুকে কায়েম রাখার জন্য, সামর্থবানদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং হাদিস শরীফে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে আল্লাহর বান্দারা! অন্তরের খুশির সঙ্গে তোমরা কোরবানি কর’ (তিরমিজি’ ইবনে মাজাহ)। অপর হাদিসে কোরবানির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে। বিখ্যাত সাহাবি হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বলেন, একদিন সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এই কোরবানি কী? রাসুল (সঃ) উত্তরে বললেন, তোমাদের পিতা ইব্রাহীম (আঃ)-এর সুন্নাত (নিয়ম)। তারা পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, হে রাসুল (সঃ) এতে আমাদের জন্য কী রয়েছে? রাসুল (সঃ) বললেন, কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি করে নেকি রহিয়াছে।’ সম্মানিত পাঠক ও প্রিয় আশেকান-জাকেরানগণ কোরবানির এত ফজিলত, যা লিখে শেষ করা যাবে না। কোরবানির গোস্ত খাওয়া ও এর হকদারদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলামানদের জন্য কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে কোরবানির অসংখ্য ফজিলতের বর্ণনা রয়েছে। একদিন নবী করিম (সঃ) তাঁর কন্যা মা ফাতেমা (রাঃ)-কে বললেন, ‘ ফাতেমা, তুমি তোমার কোরবানির পশুর নিকট যাও। কেননা কোরবানির পশু জবাই করার পর রক্ত মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। তখন মা ফাতেমা (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেনÑ ‘হে আল্লাহর রাসুল, এটা কি শুধু আমার জন্য? জবাবে রাসুল (সঃ) বললেন, সকল মুসলমাননের জন্য।’ নবী (সঃ)  আরো বলেছেন, ‘আল্লাহর নিকট সব থেকে উত্তম আমল হলো কোরবানি করা। অতএব মুসলমানদের অবশ্যই কর্তব্য, মনের মধ্যে বিরাজমান যে পশুরশক্তি, ক্রোধ, লোভ, লালসা, হিংসা, পরনিন্দা এসব দূর করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য, আত্মত্যাগের মহিমায় নিজেকে উৎসর্গ করা।

(Visited 113 times, 1 visits today)
Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *