কোরআনপাকে আল্লাহতায়ালা অলীগণের মর্যাদা বর্ণনা করেছেন

আলহাজ মাওলানা হযরত সৈয়দ জাকির শাহ নকশবন্দি মোজাদ্দেদি কুতুববাগী

অলীগণ মারেফতের সাধনায় সফলকাম হয়ে তাঁদের মর্যাদা অনুসারে সৃষ্টি জগতের পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তাঁরা বিভিন্ন মোকামে ‘খলিফায়ে রাসূলুল্লাহ’ ‘ওয়ারেসুল আম্বিয়া’ ইত্যাদি পদবী লাভ করেন। বাকাবিল্লাহ ও হালে মোকামে উপনীত অলীগণ প্রত্যেক যুগে কুতুবুল আকতাব, গাউছে জামান, মোজাদ্দেদ ও গাউসুল আযম ইত্যাদি খেতাব লাভ করে, স্রষ্টার পক্ষে রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তত্ত্বাবধানে সৃষ্ট জগতের নিয়ন্ত্রণ ও ত্রাণকর্তৃত্ব লাভ করেন। তাঁরা দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতার অধিকারী। মহান আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘আলা ইন্না আউলিয়াল্লাহি লা খাউফুন আলাইহিম ওয়ালাহুম ইয়াহ্‌যানুন-আল্লাজিনা আমানু ওয়াকানু ইয়াত্তাকুন-লাহুমুল বুশরা, ফিল হায়াতিত দুনিয়া ওয়াফিল আখিরাতি লা তাবদিলা লি কলিমাতিল্লাহি জালিকা হুয়াল ফাউযুল আ’জীম।’অর্থাৎ, সাবধান! নিশ্চয় যারা আল্লাহ্‌র বন্ধু, তাদের না কোন ভয়-ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবেন। যারা ঈমান এনেছে এবং আত্ম-সংযত হয়েছে। তাদের জন্য সুসংবাদ, পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে। আল্লাহতায়ালার বাণীর কখনো পরিবর্তন হয় না। এটাই হলো মহা সফলতা।’ (সূরা, ইউনুস- আয়াত ৬২-৬৪)

আলোচ্য আয়াতে আল্লাহর অলীদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, তাদের প্রশংসা ও পরিচয় বর্ণনার সাথে সাথে, তাঁদের প্রতি আখেরাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। এরশাদ হয়েছে, যারা অলী তাদের কোন ভয় থাকবে না- এ দুনিয়াতেও এবং আখেরাতেও। যারা অলী তাদের না থাকবে কোন অপছন্দনীয় বিষয়ের সম্মুখীন হওয়ার আশংকা, আর না থাকবে কোন উদ্দেশ্য ব্যর্থতার গ্লানি। আর আল্লাহর অলী হলেন সে সমস্ত লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া পরহেজগারী অবলম্বন করেছে। এদের জন্য পার্থিব জীবনেও সুসংবাদ রয়েছে এবং আখিরাতেও। এতে কয়েকটি  বিষয় লক্ষণীয়। (১) আল্লাহর অলীগণের উপর ভয় ও শংকা না থাকার অর্থ কী? (২) অলীআল্লাহর সংজ্ঞা ও লক্ষণ কী? (৩) দুনিয়া ও আখেরাতের তাঁদের জন্য সুসংবাদের মর্ম কী?

প্রথম বিষয় ‘অলীদের কোন ভয়-শংকা থাকে না’ অর্থ এই যে, দুনিয়াতে তাঁরা সম্পূর্ণ ভীতিহীন এবং চিন্তামুক্ত। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এশকের আড়ালে অলীগণ আশ্রিত। অলীগণ সব সময় মহান আল্লাহর ধ্যান- খেয়ালে মত্ত থাকেন। তাই দুনিয়াবী কোন চিন্তা-ভাবনা বা লোভ-লালসা তাদেরকে স্পর্শ করতে পারে না। আর যে ব্যক্তি দুনিয়া ত্যাগ করেছে, সে দুনিয়াবী সকল ভয় হইতে মুক্ত। দুনিয়া ত্যাগ করার অর্থ হলো মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা। যেমন, আল্লামা জালালউদ্দিন রুমী (রঃ) বলেন, ‘ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সার নাম দুনিয়া নয়, মহান আল্লাহকে ভুলে যাওয়াই হলো দুনিয়া।’ অলীগণ সবসময় আল্লাহর জিকির বা ধ্যানে মশগুল থাকে বিধায়, দুনিয়ার কোন বিষয় তাদেরকে আল্লাহ হতে দূরে সরাতে পারে না। যদিও মুখে কারো সাথে কথা বলেন, কিন্তু তাঁদের অন্তরকরণ জীবিত বিধায়- অন্ত-রকরণের মাধ্যমে সবসময় আল্লাহর খেয়ালে ডুবে থাকেন।

ইন্তেকালের পরেও অলীগণ শংকা ও ভয়মুক্ত। কেননা, অলীগণ মহান আল্লাহর বন্ধু এবং নৈকট্যপ্রাপ্ত। আর যাঁরা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বাঁন্দা, তাঁদের জামিনদার স্বয়ং আল্লাহ। আখিরাতের হিসাব-নিকাশের পর যখন তাঁদেরকে তাঁদের মর্যাদায় জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। তখন ভয় ও আশংকা থেকে চিরতরে তাঁদের মুক্ত করে দেওয়া হবে। না থাকবে কোন রকম কষ্ট ও অস্থিরতার আশংকা, আর না থাকবে কোন প্রিয় ও কাঙ্খিত বস্তুর হাতছাড়া হয়ে যাবার দুঃখ। বরং তাঁদের প্রতি জান্নাতের নিয়ামতরাজি হবে চিরস্থায়ী, অনন্ত। এর অর্থে আয়াতের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোন প্রশ্ন বা আপত্তির কারণ নেই। কিন্তু এ প্রশ্ন অবশ্যই সৃষ্টি হয় যে, এতে শুধু অলীগণের কোন বিশেষত্ব নেই, সমস্ত জান্নাতবাসী যারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে, তাঁদের সবাই এ অবস্থায়ই থাকবে। সাধারণ মানুষও যদি জান্নাতে প্রবেশ করে, তবে অলীদের সাথে অবশ্যই তাঁদের নিয়ামতের কম- বেশি হবে।

মহান আল্লাহতায়ালা অলীদেরকে পরীক্ষা নিয়েছেন। আর অলীগণের নিকট মহান আল্লাহর পরীক্ষা কোন কষ্টের বিষয় নয়। ইহা তাদের নিকট আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে গন্য হয়। বনী ইসরাইলের এক দরবেশ সত্তর বছর যাবৎ আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল ছিল। আল্লাহ সেই যুগের নবীকে বলেন- ‘তুমি উক্ত দরবেশকে গিয়ে বল, তোমার এতদিনের ইবাদত বন্দেগী নিষ্ফল হয়েছে। উহা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। নবী দরবেশকে এই সংবাদ দেওয়া মাত্রই তিনি বসা হতে উঠে মনের আনন্দে নাচতে আরম্ভ করলেন। লোকে তাঁহার প্রাণ মাতানো নাচ দেখে বললো, তোমার তো দুঃখ করার কথা। কিন্তু নাচতেছ কেন? দরবেশ বললেন, আমার ইবাদত কবুল হয়নি ঠিক, কিন্তু আল্লহতো আমাকে স্মরণে রেখেছেন। (তথ্যসূত্র: ইসরারুল আউলিয়া)

দ্বিতীয় বিষয়টি আল্লাহর অলীগণের সংজ্ঞা ও তাঁদের লক্ষণ সংক্রান্ত। আউলীয়া শব্দটি অলী শব্দের বহুবচন। আরবী ভাষায় অলী অর্থ নিকটবর্তীও হয় এবং দোস্ত-বন্ধুত্বও হয়। অলী শব্দের অর্থ সহচর, বন্ধু, প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনকারী বান্দারাই সাধারণতঃ অলি বলে অভিহিত হন। ‘শরহে আকায়েদ’ গ্রন্থে হযরত আল্লামা সাদ উদ্দীন তাফতাজনী (রঃ) বলেন, ‘অলী হচ্ছেন ঐ ব্যক্তি যিনি আল্লাহর স্বরূপ ও তাঁর ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত থাকেন। যিনি সর্বদা আল্লাহর অনুগত থাকেন এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে বিরত থাকেন। যিনি পার্থিব ভোগ-লালসা থেকে আত্ম-সংযমী।’

আল্লাহতায়ালার প্রেমের নৈকট্যর একটি সাধারণ স্তর এমন রয়েছে যে, তার আওতা থেকে পৃথিবীর কোন মানুষ কোন জীবজন্তু এমনকি কোন বস্তু সামগ্রীই বাদ পড়ে না। যদি এ নৈকট্য না থাকে, তবে সমগ্র বিশ্বের কোন একটি বস্তুও অস্তিত্ব লাভ করতে পারতো না। সমগ্র বিশ্বের অস্তিত্ব প্রকৃত উপকরণ হলে সেই সংযোগ যা আল্লাহতায়ালার সাথে রয়েছে। যদিও, এই সংযোগের তাৎপর্য কেউ বুঝেনি বা বুঝতে পারেও না, তথাপি এই অশরীরি সংযোগ অপরিহার্য ও নিশ্চিত। কিন্তু আউলিয়া শব্দে নৈকট্যের ঐ স্তরের কথা বলা উদ্দেশ্য নয়। বরং নৈকট্য প্রেম ও অলীত্বের দ্বিতীয় আরেকটি পর্যায় বা স্তর রয়েছে যা, আল্লাহতায়ালার বিশেষ বিশেষ বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট। সে নৈকট্যকে মোহাব্বত বা প্রেম বলা হয়। এ মোহব্বত স্তরে স্তরে উন্নীত হয়। এই মোহাব্বতের স্তরে কেউ এতবেশী অগ্রগামী যা অনুবাধন যোগ্য নয়। যাঁরা নৈকট্য লাভ করতে সমর্থ হন, তাঁদেরকেই বলা হয় অলীআল্লাহ তথা আল্লাহর অলী। যেমন, হাদিসে কুদ্‌সীতে বর্ণিত হয়েছে, ‘অন আবি হুরায়রা রা. ক্বলা ক্বলা রাসুলাল্লাহি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্বলা মান আদালি অলীয়ান ফাকাদ আজানতুহু বিল হারব- মা ইয়াঝালু আবদী ইয়াতাকারবাবু ইলায়্যা বিন্নাওয়াফিলি হাত্তা আহবাবতুহু ফা ইজা আহবাবতুহু ফা কুনতু ছাময়ুহুল্লাজি ইয়াছমায়ু বিহী ওয়া বাছারুহুল্লাজি ইয়াবছিরু বিহী ওয়া ইয়াদুহুল্লাতি ইয়াবতিশু বিহা ওয়া রিজলুহুল্লতি ইয়ামশী বিহা। ’অর্থাৎ, ‘হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশাদ করেন, ‘আল্লাহতায়ালা বলেন, যে আমার অলীর বিরোধীতা করে, আমি আল্লাহ তার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করিতেছি। বান্দা যখন নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তখন আমি তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করি। যখন আমি তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করি তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শোনে। আমি তার চোখ হই, যা দ্বারা সে দেখে। আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দ্বারা সে ধারণ করে। আমি তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলাফেরা করে।’ (বুখারী শরীফ)

মহান আল্লাহতায়ালার নিকট অলীগণের এতই মর্যাদা যে, যারা অলীর বিরোধীতা করবে, স্বায়ং আল্লাহতায়ালা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। আবার অলীগণের হাত- পা কে আল্লাহর নিজের হাত- পা বলে ঘোষণা করেছেন। কেননা, ফানাফিল্লাহ-বাকাবিল্লাহ-তে অলীগণ আল্লাহতায়ালার প্রেমে বিলীন হয়ে যান। তাই আল্লাহতায়ালা যাদেরকে মর্যাদা দান করেছেন, তাদেরকে যেন আমরা কোনভাবেই কটুক্তি না করি। এখানে আরো একটি প্রশ্ন দেখা দিতে পরে যে, বেলায়েতের এ স্তর লাভের উপায় কী?

হযরত কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী (রঃ) তাফসীরে মাযহারীতে বলেছেন, উম্মতের মধ্যে এই স্তর রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহ আলইহি ওয়াসাল্লাম-এরই সংসর্গের মাধ্যমে লাভ হতে পারে। এভাবেই আল্লাহরতায়ালার সাথে সম্পর্কের সেই রূপ, যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেয়েছিলেন, স্বীয় যোগ্যতা অনুপাতে তার অংশ-বিশেষ উম্মতের অলীগণ পেয়ে থাকেন। বস্তুত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংসর্গের ফজিলত সাহাবায়ে কেরাম পেয়েছিলেন সরাসরি। আর সে কারণে তাঁদের বেলয়েতের দরজা, উম্মতের সমস্ত অলী-কুতুব অপেক্ষা বহু উর্দ্ধে। পরবতী লোকেরা এ ফজিলত এক বা একাধিক মাধ্যমে অর্জন করেন। এই মাধ্যম শুধুমাত্র সে সমস্ত লোকই হতে পারেন, যাঁরা রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রঙে রঙিন হতে পেরেছেন এবং তাঁর সুন্নতের হুবহু অনুসরণ করেছেন। এ ধরণের লোকদের সান্নিধ্য ও সংসর্গের সাথে সাথে যখন তাঁদের নির্দেশের আনুগত্য এবং আল্লাহর জিকিরের আধিক্য ঘটে তখনই তার লাভ হয়। বেলায়েতের স্তর প্রাপ্তির এটিই পন্থা যা তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। ১) অলীর সংসর্গ (২) তাঁর আনুগত্য ও (৩) আল্লাহর অধিক জিকির বা স্মরণ।

অলীগণের মর্যাদা মহান আল্লাহর নিকট এতই বেশী যে, তাঁদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন যারা করবে এবং তাঁদের আনুগত্য যারা করবে, তাদেরও কোন ভয় নেই। এক সময় আজমীরে গন্ডগোল হওয়ায় খাজা গরীবে নেওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ)-এর এক পীর ভাই ইন্তেকাল করলেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ) তার জানাজায় শরীক হলেন। দাফনের পর সকলে চলে গেলেন, কিন্তু হযরত খাজা (রঃ) একাকী তার কবরের পাশে বসে পড়লেন। হযরত খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি (রঃ) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হযরত খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি (রঃ) বলেন, আমি দেখলাম হঠাৎ করে হযরত খাজার চেহারার রঙ বদলে গেলো এবং একটু পরেই আবার স্বাভাবিক হলো এবং তিনি আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠে দাড়ালেন এবং আমাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন, বাইয়াত একটা অদ্ভুত জিনিস । এ কথার কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি উত্তরে বললেন, এ মুর্দাকে দাফন করার পর যখন সকলে চলে গেলো, তখন দেখলাম যে, আযাবের ফেরশতা এসে উপস্থিত হয়েছে। ঠিক তখন হযরত খাজা ওসমান হরুনী (রঃ) ঐ কবরে হাজির হলেন এবং ফেরেশতারা আরজ করলো, হে খাজা ওসমান হরুনী! অবশ্যই এ ব্যক্তি আপনার মুরিদ ছিলো, কিন্তু আপনার তরিকার খেলাফ ছিল। হযরত খাজা ওসমান হারুনী (রঃ) বলেলেন, তা ঠিক, কিন্তু এ ব্যক্তি তার সত্ত্বাকে আমি ফকীরের সত্ত্বার সাথে বিলীন করে দিয়েছিলো, তাই আমি চাই না যে, এ লোক শাস্তি পাক।’ তিনি এ কথা বলার সাথে সাথে ফেরশতাদের প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার আদেশ হলো, তোমরা ফিরে চলে আস, ওকে আর কিছু বলিও না। আমি আমার বন্ধুর সম্মানে তাকে ক্ষমা করেছি। এ কথা শুনে ফেরেশতারা ফিরে চলে গেলো। (সুত্র: রাহাতিল কুলুব)

আল্লাহতায়ালা পর্যন্ত হুজুুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উসিলায় এবং হুজুুরপাক পর্যন্ত অলীগণের উসিলায় পৌঁছতে হয়। সাহাবাগণ প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিনা মুবারক হতে সরাসরি নূরে বেলায়েত হাসিল করেছেন। পরবর্তীগণ সাহাবাগণের পবিত্র সিনা হতে, আর আমাদের জন্য অলীগণের সিনা মুবারকই এমন স্বচ্ছ আয়না, যা হতে আলো ধারণ করে তাঁরা গোটা জগতকে আলোকিত করছেন। এ জন্যই প্রদীপের আশ্রয়ে এসে দীপ্তি অর্জন করার জন্য বাইয়াত করা হয়। নবীগণ জাহের ও বাতেন চরিত্রকে ইসলাহ করার জন্য তাশরীপ এনেছেন। নবুয়তের ধারাবাহিকতা শেষ হওয়ার পর জাহেরী ও বাতেনী শিক্ষা দিয়া কামেল পীর-মুর্শিদগণ এসলা করে থাকেন এবং ‘তাসকিয়ে নফস’এর মোকামে পৌঁছিয়ে দেন। যেহেতু, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নত তরিকা ও বেলায়েত কেয়ামত পর্যন্ত জারি রাখার জন্য, কামেল পীর-মুর্শিদগণ এ শিক্ষা দিয়ে থাকেন।

লোহার মরিচা দূর করার জন্য উত্তাপের প্রয়োজন। এভাবে কলবের মরিচা বা জং দুর করার জন্য প্রয়োজন অলীগণের সোহবত, ইবাদত ও রিয়াজত। কিন্তু অলীগণের সোহবতই অধিকতর প্রভাব সৃষ্টি করে। অলীগণকে নেক দৃষ্টি মুহূর্তে মানুষের অন্তরাত্মার আমুল পরিবর্তন এনে দেয়। মাওলান রুমী বলেন, ‘এক জামানা সোহবতে বা আউলিয়া – বেহ্‌তর আয ছদ ছালেহ ত-য়াতে বে-রিয়া।’ অর্থাৎ, শত বছরের খাঁটি ইবাদতের চেয়ে অলীগণের সাথে কিছুক্ষণ সোহবত অনেক উত্তম।’ অন্য কবির ভাষায়, ‘নেগাহ্ মরদ মুমিন ছে পালটা জাতিহে তাক্বদিরী।’ অর্থাৎ, আল্লাহর অলীদের নেক দৃষ্টিতে তাকদীর পরিবর্তন হয়ে যায়।’

একদিন গাউছেপাক (রঃ) জঙ্গল দিয়ে একাকী যাচ্ছিলেন, তাঁর পড়নে ছিল অত্যন্ত মূল্যবান পরিচ্ছেদ। এক ডাকাত তা ছিনিয়ে নেয়ার বদ খেয়ালে তাঁর জামার আস্তিন ধরলেন, তিনি সাথে সাথে আরজ করলেন, ‘মাওলা! সে তো আব্দুল কাদিরের আস্তিন ধরেছে, কিয়ামত পর্যন্ত সে যেন আর না ছুটে। খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রঃ) এক কুমারের ভিটিতে গেলেন, সেখানে মাটি দ্বারা থালা তৈরি করতেছিল। তিনি এসে এর ওপর নজর দিলে অগ্নি তো নূর হয়ে গেলই, উপরন্তু মাটির থালার উপর আল্লাহর নামের নকশা অঙ্কিত হয়ে গেল। কুমার এমতাবস্থায় বিস্মিত হয়ে বললো, হে নকশবন্দের বাদশাহ! আপনি আমার কলবে এমন নকশা এঁকে দিন, যেমনিভাবে লোকেরা আপনাকে নকশবন্দ ডেকে থাকে।

নফস হচ্ছে কুকুর, তার গলায় কোন শায়খের বেল্ট বেঁধে দাও, যাতে পথভ্রষ্ট না হয়। অলীর আনুগত্য হচ্ছে নফসের বেল্ট, তাঁর প্রদত্ত শাজারা হচ্ছে নফসের জিঞ্জির, যেটির প্রথম কড়া নফসের গলায় আর শেষ কড়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর পবিত্র হাতে। এই বেল্ট এবং শিকল বাঁধা থাকলে নফস কখনো গুমরাহ হবে না ইনশাল্লাহ্। তাই আ’লা হযরত (রঃ) এরশাদ করেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার মহান দরবারে কুত্তার সাথেই আমার সম্পর্ক, আমার গলায় আপনার দরবারের বেল্ট লাগানো, কিয়ামতেও যেন এই বেল্ট থাকে, কেননা এই বেল্ট লাগানো গোলামের কোন ভয় নেই। (সূত্র: শানে হাবিবুর রহমান- মুফতি আহমদ ইয়ার খান নইমী রঃ)

দুনিয়ায় একজন মুসাফিরের জন্য যেমন রাহবার বা পথ প্রদর্শকের প্রয়োজন হয়, ভিনদেশে রাহবার ব্যতিরেকে চলা সম্ভব নয়। তদ্রুপ আখেরাতের মুসাফিরের জন্যও রাহবারে তরিকত প্রয়োজন। নতুবা রাস্তা থেকেও শুধু রাস্তাতেই উদাসীনভাবে ঘুরবে। তাই মাওলানা রুমী (রঃ) বলেন- ‘ভালোভাবে পীর ধর, কেননা পীর ব্যতিরেকে এই সফর ভয়ভীতিপূর্ণ এবং বিপদ সঙ্কুল। আর পীর ধরার পর তুমি তাঁর নিকট নিজেকে সোপর্দ করে দাও। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর মত খিজির আলাইহিস সালাম-এর হুকুমের অধীনে চল। যদিওবা খিজির আলাইহিস সালাম-এর মত নৌকাকে ভেঙ্গে ফেলে, তুমি আওয়াজ করো না। বেগুনাহ শিশুকে কতল করে ফেললেও তুমি নড়াচড়া করো না।

দুনিয়ায় মানুষ অর্জন করার জন্যই এসেছে। ঈমান এবং আমলই হচ্ছে তার অর্জিত সম্পদ। যেটিকে আখেরাতে পাঠাতে হবে। পথে নফস এবং শয়তান ডাকাতি করে থাকে। অতএব, ঈমান ও আমলের এই মূল্যবান সম্পদ কারো নিরাপত্তায় থাকা বাঞ্ছনীয়। আর এই নিরাপত্তা বিধানকারীগণের জামায়াত হচ্ছে আউলিয়া কেরাম। বীমা কোম্পানীর জিম্মায় মাল হেফাজত থাকে আর তরিকতের মাশায়েখগণের নেক দৃষ্টিতে ঈমানের সম্পদ মাহফুজ থাকবে।

ইঞ্জিন এটা দেখে না যে, তার পেছনে তৃতীয় শ্রেণীর বগী রয়েছে, না দ্বিতীয় শ্রেণীর, না ইন্টার, না মাল গাড়ী; সে তা তার শক্তি অনুযায়ী সবকিছুই টেনে নিয়ে যাবে, শুধু শর্ত এই যে, তার সাথে কঠিন শিকলে আবদ্ধ থাকতে হবে। ইসলাম হচ্ছে রেল লাইনের মত, বিভিন্ন শ্রেণীর মুসলমান মূলতঃ বিভিন্ন বগী, অলীগণ হচ্ছেন এর শক্ত শিকল, আর হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন সবার রাহবার। যদি এই সিলসিলা তাঁর সাথে সম্পৃক্ত থাকে, তবে অবশ্যই আমরা আমাদের লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে যাব, নতুবা পৌঁছাতে পারবো না। (সুত্রঃ শানে হাবিবুর রহমান- মুফতি আহমদ ইয়ার খান নইমী রঃ)

(Visited 278 times, 1 visits today)
Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *