কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার সালাত বা নামাজের হিসাব হবে

আলহাজ মাওলানা হযরত সৈয়দ জাকির শাহ্ নকশবন্দি মোজাদ্দেদি কুতুববাগী

হযরত রাসুলুল্লাহ (সঃ) মদিনায় হিজরত করার পূর্বে মক্কায় অবস্থানকালেই নামাজ ফরজ হইয়াছিল। ৬নং হাদিসে উল্লেখ হইয়াছে, মক্কাবাসী আবু সুফিয়ান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের এক প্রশ্নের উত্তরে এই উক্তি করিয়াছেন যে, (এই নবী) আমাদিগকে নামাজ, সত্যবাদিতা ও সংযমশীলতার আদেশ করিয়া থাকেন। (বোখারী শরীফ পৃ: ১৭৭) কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার সালাত বা নামাজের হিসাব হবে, যদি সালাত ঠিক হয় তবে তার সকল আমল সঠিক বিবেচিত হবে। আর যদি সালাত বিনষ্ট হয় তবে তার সকল আমলই বিনষ্ট বিবেচিত হবে। (তিরমিজি ২৭৮)

সূরা মুদ্দাছ্ছির, ৪০-৪৫নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন,
‘ইয়াতাসা-য়ালূন। আনিল মুজ্বরিমীনা। মা-সালাকাকুম্ ফী সাক্বার। ক্বা-লূ লাম নাকু মিনাল মুছোয়াল্লীন। ‘অলাম নাকু নুত্ব-ইমূল মিসকীন্। অকুন্না-নাখূদ্বু মা’আল খ-য়িদ্বীন’। অর্থ: পাপীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তোমরা কেন জাহান্নামে যাইতেছ? তারা বলবে, আমরা নামাজি ছিলাম না। মিসকিনদেরকে আহার করাইতাম না। দোষ তালাশীদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত ছিলাম। যার কারণে আজ আমরা জাহান্নামে যাচ্ছি। (সূরা মুদ্দাছ্ছির আয়াত নং ৪০-৪৫)

 ‘অ-মা খালাক্ব তুল জ্বিন্না অল ইনসা ইল্লা লিইয়া বুদূন’। অর্থ: আমি মানব ও জ্বীন জাতিকে একমাত্র আমার এবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।  (সূরা জারিয়াত, আয়াত ৫৬)

‘ক্বাদ আফলাহাল মু‘মিনূন। আল্লাযীনা হুম ফী ছলা-তিহিম্ খা-শি‘ঊন।অর্থ: মুমিনগণ সফলকাম, যারা তাদের সালাতে নম্রতা ও ভয়-ভীতির সাথে দন্ডায়মান হয়। (সূরা মু‘মিনূন, আয়াত ১-২)

‘ওয়াল্লাযীনা হুম আলা-স্বালা-তিহিম ইউহা-ফিজুন উলা-ইকা ফী জ্বান্না-তিম মুক্রামুন।’ অর্থ: আর যারা তাদের নিজেদের নামাজ যত্নের সহিত হেফাজত করে অর্থ্যাৎ যথাযথভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ আদায় করে তারা-ই জান্নাতে অতি সম্মান-ইজ্জতের সাথে বাস করবে। (সূরা মা’আ-রিজ আয়াত ৩৪-৩৫)

‘ফাওয়াইলুল্লিল মুছোয়াল্লিন। আল্লাযীনাহুম্ আন ছলাতিহিম্ সা-হুন।’ অর্থ: আফসোসের বিষয় সেই নামাজিদের জন্য, যারা তাদের সালাতে অমনযোগী উদাসিন থাকে। (সূরা মাউন, আয়াত ৪-৫)

‘অল্লাযীনা হুম্ আলা-ছালাওয়া তিহিম্ ইয়ূহা-ফিজূন। উলা-ইকা হুমুল ওয়া রিছুন। আল্লাযীনা ইয়ারিছুনাল্ ফিরদাউসা হুম ফীহা খা-লিদূন।’ অর্থ: আর যারা তাদের নামাজে যত্নবান, তারা-ই জান্নাতের ওয়ারিশ, যারা ফিরদাউসের ওয়ারিশ হবে এবং তথায় তারা চিরকাল থাকবে। (সূরা আল মু‘মিনূন, আয়াত ৯,১০,১১)

‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাযীনা আ-মানূ লা তাক্ব রাব্বছলাতা অ-আনতুম সুকারা হাত্তা তা’লামূ মা-তাক্বুলূনা অলা-জ্বুনুবান ইল্লা আবিরি সাবীলিন্ হাত্তা তাগ্তাসিলূ; অইন কুন্তুম্ মারদোয়া আও-আলা সাফারিন আও জ্বা-য়া আহাদুম মিন্কুম মিনাল্ গা-য়িত্বি আও লা মাস্তুমুন নিসা-য়া ফালাম তাজ্বিদূ মা-য়ান ফাতাইয়া ম্মামু ছোয়াদ্দান তোয়াইয়্যিবান ফাম্সই বিউজ্বু হিকুম অ-আইদীকুম ইন্নাল লাহা কানা আফুওয়্যান গাফুরা।’ (সূরা নিসা, আয়াত ৪৩) অর্থ: হে মুমিনরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা নামাজের কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না তোমরা যা বল তা বুঝতে পার আর নাপাক অবস্থায়, যতক্ষণ না তোমরা গোসল কর, তবে মুনাফিক হলে অন্য কথা। আর যদি তোমরা রুগী হও, সফরে থাক বা কেউ শৌচাগার হতে আস বা স্ত্রীসহবাস কর, আর পানি না পাও তবে তোমরা পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম কর আর মাসেহ কর চেহারা ও তা নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল গুনাহ মার্জনাকারী। সবকিছুর মূল হল ইসলাম, আর ইসলামের খুঁটি সালাত। (তিরমিজি শরীফ)। তোমরা অটুট ও অবিচল থাক, গণনা করো না, আর মনে রাখবে তোমাদের সর্বোত্তম আমল হল সালাত, একজন মুমিন অবশ্যই সর্বদা অজুর সাথে থাকতে চেষ্টা করবে। (ইবনে মাজাহ, পৃ: ২৭৩)

সালাত আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপকরণ। হযরত সাওবান (রাঃ) নবী করিম সাল্লাাল্লাহি আলাইহিস সাল্লামকে, এমন আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন যা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহি আলাইহিস সাল্লাম উত্তরে বললেন, তোমরা বেশি করে আল্লাহর জন্য সেজদা/ সালাত আদায় করতে থাক, তোমার প্রতিটি সেজদার কারণে আল্লাহ তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং তোমার গুনাহ মাফ করবেন। (মুসলিম শরীফ, পৃ: ৭৩৫) বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নৈকট্য লাভ করে যখন সে সেজদারত থাকে। সুতরাং তোমরা সেজদার অবস্থায় বেশি বেশি প্রার্থনা কর। (মুসলিম শরীফ, পৃ: ৭৪৪) সালাত পাপ মোচনকারী এবং ছোট ছোট গুনাহের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ। রাসুল সাল্লাল্লাহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এক জুমা হইতে আর এক জুমা মধ্যবর্তী গুনাহসমূহের প্রায়শ্চিত্ত করে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে কবিরা গুনাহে লিপ্ত না হয়। (মুসলিম শরীফ, পৃ: ৩৪৪)

‘মান তারাকাস্ সালাত মুতায়াম্মিদাম ফাক্বাদ কাফারা।’ অর্থ: যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে সালাত ছেড়ে দিল, সে যেন কুফরি করল। (বুখারী শরীফ)মুসলিম বান্দা যখন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করে, তখন তার গুনাহ এমনভাবে ঝরে পড়তে থাকে যেমন বৃক্ষের পাতা ঝরে। (মসনদে আহমদ)

ব্যাখ্যা : মানুষের জন্য কিছু দৈহিক, আত্মিক ও আর্থিক এবাদতের প্রচলন করেছেন। দৈহিক এবাদতের মাঝে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও মহান এবাদত হল সালাত। সালাত এমন একটি এবাদত যাকে আল্লাহ তাঁর মাঝে এবং তাঁর বান্দার মাঝে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম সাব্যস্ত করেছেন। সালাতের মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর সাথে দেয়া প্রতিশ্রুতির বার বার প্রতিফলন ঘটায়। সে তার প্রভু বা স্রষ্টাকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, সে তার প্রতিশ্রুতি পালন করে যাচ্ছে। এই সালাতের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। আল্লাহর সাথে মানুষের বন্ধন সুদৃঢ় ও মজবুত হয়। ইহকাল ও পরকালের মুক্তির পথ কণ্টকমুক্ত হয়। সালাত ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি, শৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ ফিরিয়ে আনে। সালাতের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ হয়।

সালাতের বৈশিষ্ট্য: সালাত এমন এক এবাদত যা সারা-বছর দৈনিক পাঁচ বার আদায় করতে হয়। মৃত্যু ছাড়া আর কোন অবস্থাতেই সালাত মাফ হয় না, এমনকি মৃত্যুশয্যাতেও সালাত হতে বিরত থাকার কোন বিধান নাই। আল্লাহতায়ালা প্রথমে মেরাজের রজনীতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। তারপর আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়া করে তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্তে নিয়ে আসেন। তবে সওয়াব ও বিনিময় পঞ্চাশ ওয়াক্তেরই জারী রাখেন। সুতরাং যে ব্যক্তি দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে আল্লাহতায়ালা তাকে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের সওয়াব প্রদান করবেন। সালাত একমাত্র এবাদত যা আল্লাহতায়ালা সাত আসমানের উপরেই ফরজ করাকে শ্রেয় মনে করেছেন। আল্লাহর একাত্ববাদ ও মুহাম্মদ (সঃ)-এর রেসালাতের স্বাক্ষ্য দেয়ার পর সালাত হল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি রুকন।

(Visited 1,396 times, 1 visits today)
Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *