উছিলা বা মধ্যস্থতা ধরার ব্যাপারে কোরআন মাজিদে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে

আলহাজ মাওলানা হযরত সৈয়দ জাকির শাহ্ নকশবন্দি মোজাদ্দেদি কুতুববাগী

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেছেন, হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ) বেহেশত থেকে বের হওয়ার পর, চল্লিশ (৪০) বছর যাবত কিছুই পানাহার করেননি, আর লজ্জার কারণে তিনশ (৩০০) বছর যাবত উপরের দিকে মাথা তোলেননি। এই সুদীর্ঘ সময় তাঁরা আল্লাহর শাহী দরবারে ক্রন্দনরত ছিলেন (খোলাসাতুত তাফসীর)।

হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ) তাঁর নিকট সামান্য ভুলের জন্য কত কান্নাকাটি করেছিলেন তার একটি বিবরণ পেশ করেছেন ইমাম ফকরুদ্দীন রাজী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তাফসীরে কবীর’-এ এক পর্যায়ে তিনি একখানি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। বর্ণিত আছে যে, হযরত নবী করিম (সঃ) এরশাদ করেছেন, ‘যদি সারাদুনিয়ার মানুষের কান্নাকাটি একত্রিত করা হয়, তবুও হযরত দাউদ (আঃ)-এর কান্নাকাটিই অধিকতর হবে। আর যদি সারাদুনিয়ার মানুষের ক্রন্দন এবং হযরত দাউদ (আঃ)-এর ক্রন্দনকে একত্রিত করে হযরত নূহ (আঃ)-এর ক্রন্দনের পাশাপাশি রাখা হয় তাহলে হযরত নূহ (আঃ)-এর ক্রন্দনই অধিকতর প্রমাণিত হবে। আর যদি সারাদুনিয়ার মানুষের ক্রন্দন এবং হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত নূহ (আঃ)-এর ক্রন্দনকে একত্রিত করা হয় আর যদি হযরত আদম (আঃ) তার একটি ভুলের জন্য যে ক্রন্দন করেছিলেন তা সামনে রাখা হয়, তাহলে হযরত আদম (আঃ)-এর ক্রন্দন অধিকতর বলে প্রমাণিত হবে’
(তাফসীরে কবীর- ১ম খন্ড)।

হযরত আদম (আঃ)-এর কান্নাকাটির কারণে, তাঁর প্রতি আল্লাহপাকের দয়া হল। তিনি তাঁকে তওবার পন্থা শিখিয়ে দিলেন আর যে ভাষায় তওবা করতে হবে তাও শিখিয়ে দিলেন। হযরত উমর (রা:) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ)-কে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত রাসুলে করিম (সঃ)-এর ওছিলায় আল্লাহপাকের মহান দরবারে ক্ষমা প্রার্থী হয়েছে। তখন আল্লাহপাক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আদম! মোহাম্মদ (সঃ)-কে তুমি কীভাবে জানলে?

তদুত্তরে হযরত আদম (আঃ) আরজ করলেন, হে প্রভু! আমার সৃষ্টির পর আমি যখন আরশের দিকে তাকালাম তখন তাতে দেখতে পেলাম লেখা হয়েছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। তখনই আমি উপলদ্ধি করেছি যে, আপনার মহান দরবারে সর্বাধিক সম্মানের অধিকারী হলেন হযরত মোহাম্মদ (সঃ)। এ জন্যই তাঁর ওছিলায়ই ক্ষমা প্রার্থনা করেছি। তখন আল্লাহপাক এরশাদ করেন, হে আদম! তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, তিনি তোমাদেরই সন্তান। তাঁকে সৃষ্টি না করলে আমি তোমাকেও সৃষ্টি করতাম না (খোলাসাতুত তাফসীর)।

অতঃপর আল্লাহপাক হযরত আদম (আঃ)-কে শিক্ষা দিলেন, কোন কথা বললে তওবা কবুল হবে, কোন দোয়া পাঠ করলে তাঁর আরজি মঞ্জুর হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, সেই দোয়াটি হল, ‘রাব্বানা জ্বালাম্‌না আন্ ফুছানা ওয়া ইল্লাম তাগ্‌ফিরলানা ওয়াতার হাম্‌না লানা কূনান্না মিনাল খাছিরিন’।

অর্থ : হে আমাদের পালন কর্তা! আমরা আমাদের নিজেদের উপর জুলুম করেছি যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন। আর আমাদের উপর দয়া না করেন তাহলে অবশ্যই আমরা নিতান্ত ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের মধ্যে গণ্য হয়ে যাব। এই কথাগুলো দ্বারা হযরত আদম (আঃ) মোনাজাত করলেন তখন আল্লাহপাক তাঁর তওবা কবুল করলেন। সূরা আ’রাফের এক আয়াতের ঘোষণা অনুযায়ী হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ) উভয়ই এই দোয়া করেছিলেন। মোট কথা রাসুল (সঃ)-কে ওছিলা ধরার কারণে আল্লাহতায়ালা গুনাহ্ মাফ করলেন এবং তওবা কবুল করলেন। হে পাঠকগণ! কোরআন ও হাদিস পর্যালোচনা করে দেখা গেল, আল্লাহতায়ালার গোপন ভেদ ও রহস্য লুকাইয়া আছে যদি আদম (আঃ) ভুল না করত আমরা সৃষ্টি হতাম কীভাবে? এখন এই হাকিকত ভেদ বুঝতে হলে চৈতন্য গুরু বা কামেল মুর্শিদের সান্নিধ্যে গেলে আদম (আঃ)-কে সৃষ্টির রহস্য জানা যাবে।

‘ওয়া লাও আন্নাহুম ইয্ব য্বালামু আন্ ফুসাহুম্ জ্বাউকা ফাস্তাগফারুল্লাহা ওয়া-সতাগফারা ওলাহুমুর রাসুলু লাওয়াজ্বাদু-ল্লাহা তাওয়্যা বার্‌ রাহিমা’ (সূরা : নিসা আয়াত ৬৪)।

অর্থ : যদি এ সকল লোকেরা নিজেদের আত্মাসমূহের ওপর অত্যাচার করে, হে নবী (সঃ) আপনার দরবারে এসে হাজির হয়ে যায় এবং আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবায়ে নছুহা করে এবং আপনিও (ইয়া রাসুলুল্লাহ সঃ) তাদের পক্ষে সুপারিশ করেন, তাহলে নি:সন্দেহে এরা আমি আল্লাহতায়ালাকে তওবা কবুলকারী, ক্ষমাকারী মেহেরবান হিসেবে পাবে। এ আয়াত কারীমা দ্বারা প্রমাণ হয়ে গেল হুজুর (সঃ) প্রত্যেক গুনাহ্গারের জন্য সর্বসময় (কিয়ামতাবধি) মাগফিরাতের (ক্ষমা) ওয়াছিলা।

‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাযিনা আ-মানু আত্বীউল্লা-হা ওয়া আত্বীউর রাসুলা, ওয়া উলিল আম্‌রী মিন্‌ কুম , ফাইন্ ত্বানা যাতুম-ফী শাইয়িন্ ফারুদ্দুহু ইলাল্লা-হি ওয়ার রসুলী ইন্ কুন-তুম তুমিনূনা বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমি-ইল আখির, যা-লিকা খারুওঁ ওয়া আহসানু তাবিলা’ (সূরা : নিসা, পারা- ৪ আয়াত- ৫৯)।

অর্থ : হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ, রাসুল (সঃ) ও আউলিয়াগণের আনুগত্য কর। কোন বিষয়ে মতভেদ দেখা দিলে তা আল্লাহ ও রাসুল (সঃ)-এর ওপর ন্যস্ত কর। যদি আল্লাহ এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখ, এ ব্যবস্থা তোমাদের জন্য উত্তম।

‘আলা ইন্না আওলিয়া আল্লাহি-লা খওফুন আলাইহিম ওয়ালাহুম ইয়াহ্যানুন’। আল্লাযীনা আ-মানু ওয়াকানু ইয়াত্তা কুন। লাহুমুল বুশ্‌রা ফিল হা-ইয়া-তিদ দুনইয়া ওয়া ফিল আখিরাহ, লা-তাবদীলা লিকালিমা তিল্লাহু, যা-লিকা হুওয়াল ফাউযুল আযীম। (সূরা : ইউনুছ, আয়াত- ৬২-৬৫)

অর্থ : জেনে রাখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তাঁরা কোন বিষয়ে দুঃখিত হবেন না। যারা বিশ্বাস করেন এবং সাবধানতা অবলম্বন করেন তাদের জন্য পার্থিব জীবনে ও পরলৌকিক জীবনে সু-সংবাদ আছে। আল্লাহতায়ালার বাণীর কোন পরিবর্তন নেই, এটিই মহা সাফল্য।

‘ইনাল্লাহা ক্বালা মান আদালি ওয়ালিইয়ান আযানতুহু বিল হারবী, ওয়ামা তাক্বাররবা ইলাইয়া আবদি বিশাই-ইন আহাব্বু ইলাইয়া মিম্‌মা ইকতারাসতু আলাইহি, ওয়ামা ইয়াযানু আবদি সামআহ আল্লাজি ইয়াসমাউ বিহী ওয়া বাসারাহু লাল্লাযি ইয়ুবসিরু বিহী ওয়াইয়াদাহু লাল্লাতি ইয়াবতিশু বিহা ওয়ারিজলাহু লাল্লাতি ইয়ামশি বিহা আলফা’ (হাদিসে কুদ্সী, রাওয়াহু বুখারী ও মিশকাত শরীফ)।

অর্থ : আমার বান্দা ফরজ আদায়ের মধ্য দিয়ে আমার নৈকট্য লাভ করে, ফরজ আদায়ের পর নফল ইবাদতের মাধ্যমে তারা আমার ভালোবাসা লাভ করে, আমি যখন কাউকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে। যখন সে আমার কাছে কিছু চায় আমি তাকে তা দিই’ (হাদীসে কুদ্‌সী, বুখারী ও মিশকাত শরীফ)।

‘ওয়ালা-তাকুলু লিমাই ইয়ুক্বতালূ ফী-সাবীলিল্লা-হি আমওয়াত; বাল্ আহ্ইয়া উওঁয়ালা কিল্ লা-তাশউরুন’ (সূরা : বাক্বারা, পারা- ২ আয়াত- ১৫৪)।

অর্থ : যারা আল্লাহর মহব্বতে জীবনকে উৎসর্গ করেছে, তাদেরকে মৃত মনে কর না বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা তা বোঝ না।

‘ওয়াল তাহ্‌ সাবান্নাল্লাযীনা কুতিলু ফী-সাবিলিল্লা-হি আমওয়া তা, বাল আহুইয়া-উন ইন্দা রাব্বিহিম ইউরযাকু-ন’।

অর্থ : যারা আল্লাহর মহব্বতে জীবনকে উৎসর্গ করেছে, তাদেরকে মৃত মনে কর না, বরং তারা জীবিত, স্বীয় রবের নৈকট্যপ্রাপ্ত, স্বীয় রবের পক্ষ থেকে রিযিকপ্রাপ্ত’ (সূরা : ইমরান পারা : ৩ আয়াত : ১৬৯)।

‘ক্বালা উমর বিন খাত্তাব রাদিআল্লাহুতায়ালা আনহু আন্নাহু ক্বালা ক্বালা রসূলুল্লাহি সাল্লাল্লাহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদ-দু-আউ মাউকুফুন বাইনাসামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব ইল্লা বিসসালাহ’।

অর্থ : হযরত উমর (রা:) থেকে বর্ণিত হাদিস, নবী করীম (সঃ) বলেছেন যে, দরূদ শরীফ পাঠ করা না হলে উম্মতের দোয়াসমূহ আসমান ও জমিনের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। যখন দরূদ শরীফ পাঠ করা হয়, তখন তা আল্লাহতায়ালার দরবারে পেশ করা হয় এবং তা কবুল হয়’ (মিশকাত শরীফ)।

‘মান আদালি ওয়ালি ইয়ান ফাকাদ আযান তাহু বিলহারবী’ (রওয়াহু মুসলিম)।
অর্থ : যে ব্যক্তি আমার কোন আউলিয়ার সাথে শত্রুতা বা দুশমনি করে, আমি তাকে যুদ্ধের জন্য আহ্বান জানাই।

‘আন আলী কারামাল্লাহু ওয়াজহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্বালা ইন্নি সামিইতু রাসুলাল্লাহি (সঃ) ইয়াকুলু আল আবদালু ইয়াকুনুনা বিশশামী ওয়াহুম আরবাউনা রজুলানা কুল্লামা মাতা রজুলুন আবদাল্লাতু মা কানাহু রুজালান ইউহক্বা বিহিমুল গাইনু ওয়াইনতাসারু বিহিম আলাল আদা-ই-ওয়া ইউতনরাফু আন আহলিমশামী বিহীমুল আজিব্বু’ (রওয়াহু মিশকাত)।

হযরত আলী (রা:) বর্ণনা করেন, আমি নবী করিম (সঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, সিরিয়ায় চল্লিশজন আবদাল আছেন তাদের ওছিলায় বৃষ্টি বর্ষিত হয়, শত্রুরা তাদের ওছিলায় পরাজিত হয় এবং তাদের ওছিলায় সিরিয়াবাসীদের ওপর থেকে আযাব দূরীভূত হয়’ (মিশকাত শরীফ)।

হে সম্মানিত পাঠকগণ! মহান আল্লাহতায়ালার সৃষ্টির শুরু থেকেই ওছিলার মাধ্যমে সকল কিছু সম্পন্ন করে আসছেন। অথচ আল্লাহতায়ালার কথা অমান্য করে কিছু সংখ্যক মানুষ কোরআন ও হাদিসের অপব্যাখ্যা করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে বর্তমান সমাজে অশান্তি করছেন। তাই এদেরকে মহান আল্লাহতায়ালা হেদায়েত দান করুন, আমিন।

(Visited 379 times, 4 visits today)
Share