কামেল পীর-মুর্শিদের উছিলায় অন্তরের শয়তান দূর হয়

মাওলানা আইয়ুব আলী হাসান

শরিয়তি শয়তানের চেয়ে অন্তরের শয়তান মারাত্মক বা জঘন্য। তা দূর করতে হলে খাঁটি অলি বা মুর্শিদের নিকট বাইয়াত হয়ে ওছিলা তালাশ করতে হয়। যেহেতু ওছিলা হল যুগের শ্রেষ্ঠ অলি বা কামেল মুর্শিদ। খাজাবাবা কুতুববাগী বর্তমান যুগের কামেল মুর্শিদ। তাই সময় থাকতে জামানার মুর্শিদ ধরে তাঁর হাতে হাত রেখে বাইয়াত গ্রহণ করার জন্য নিজেকে এগিয়ে নিয়ে আসুন। যদি আসতে পারেন তাহলে বুঝতে পারবেন।

শয়তান কী ও কেন :

শরিয়তি শয়তান ও মারেফতি শয়তান। শরিয়তি শয়তান অকর্তা, নিস্ক্রিয় ও অথর্ব। মারেফতি শয়তান কর্তা, সক্রিয় এবং বিচরণশীল। শরিয়তি শয়তান আসলে কোন শয়তানই নয়। শরিয়তি শয়তান একটি মোটামুটি ধারণা দিতে পারে, এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা শরিয়তি শয়তানের নেই এবং বিধানও রাখা হয়নি। এক কথায় শরিয়তি শয়তান ও মারেফতি শয়তানের কাজ-কর্ম কেমন হতে পারে তার একটি ধারণা দিচ্ছি। শরিয়তি শয়তান তিন প্রকার এবং মারেফতি শয়তান চার প্রকার। শরিয়তি শয়তান একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে। আর মারেফতি শয়তান মাত্র দুইটি স্থানে অবস্থান করে। শরিয়তি শয়তান নামে মাত্র শয়তান, তবে মূল্যহীন নয়। মারেফতি শয়তান ভয়ঙ্কর এবং যত প্রকার অপকর্ম আছে তা সে তৈরী করে। মারেফতি শয়তানটাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যই শরিয়তি শয়তানটি রাখা হয়েছে। সত্যকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যই অনেক সময় রূপকের প্রয়োজন হয়। মারেফতি শয়তান আসল শয়তান, আসলকে বলা হয় হাকীকি। তাই নাম হল মারেফতি শয়তান। রূপক শয়তান তিন প্রকার এবং তিন স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় এবং নড়াচড়া করার কোন ক্ষমতা বা অধিকার দেয়া হয়নি। সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে মাত্র একটি দেশে পাওয়া যায়, সে দেশটির নাম সৌদি আরব। বিশাল সৌদি আরবের শুধু মক্কা নগরীতে পাওয়া যায় এবং এই নগরীর পশু কোরবানীর মিনা নামক স্থানে তিনটি শয়তান পাওয়া যায়। বড় শয়তান, মেঝ শয়তান ও ছোট শয়তান। প্রত্যেক হাজীকে হজ করার সময় এই তিনটি শয়তানকে পাথর ছুড়ে মারতে হয়। সুতরাং বড়, মেঝ এবং ছোট তিনটি শয়তানকে শয়তান বলে মানতে হবে, যদিও হাকিকতে তিনটির একটিও শয়তান নয়। তিনটি শয়তান এ জন্যই রাখা হয়েছে যেন আসল শয়তান তথা হাকীকি শয়তানগুলোকে চিনতে পারে, জানতে পারে এবং পরিষ্কার বুঝতে পারে। আসল শয়তান চারটি ইবলিশ, শয়তান, মরদুদ এবং খান্নাস। এই চারটি শয়তানও আবার আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টি জগতে মাত্র দুটি স্থানে থাকে এবং আর কোথাও থাকে না এবং থাকার কোন আইন আল্লাহতায়ালা রাখেননি। এক জিনের অন্তর এবং অপরটি মানুষের অন্তর। এই দুটি অন্তর ছাড়া আসল শয়তানের থাকার অনুপরিমাণ স্থানও রাখা হয়নি।

আকাশ হতে যে শয়তানকে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করে, এটা জ্বিন ও মানুষের মনের আকাশ নয়, পৃথিবীর উপরের আকাশ। আসল শয়তান মক্কার মিনাতে থাকে না; থাকে হাজীদের অন্তরে। ইবলিশ মাটিতে থাকে না বরং থাকে মানুষ ও জ্বিনের অন্তরে। মরদুদ পৃথিবীতে থাকে না, থাকে জ্বিন এবং মানুষের অন্তরে। খান্নাস আকাশ আর মাটিতে থাকে না, থাকে কেবল মানুষ ও জ্বিনের অন্তরে। সব সময় মনে রাখতে হবে এ চারটি শয়তান কেবল মানুষ ও জ্বিনের অন্তরে থাকে। এই প্রাথমিক ধারণাটি জানা না থাকলে ইসলামের মূল রহস্য বোঝা বড়ই কষ্টকর হয়ে পড়ে। মানুষ সব সময় মনে করে যে, শয়তান বাহিরে থাকে এবং এই বাহিরে থাকার ধারণাটিই ইসলামকে বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ ভাবতেই চায় না যে শয়তান তার অন্তরেই লুকিয়ে আছে। শয়তান নানা সভ্যতার জাগতিক পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। বাধা হয়ে দাঁড়ায় যখন আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় ধ্যান সাধনায় মশগুল হতে চায়। আল্লাহর রহস্য জানবার পথে সাধকের প্রতিটি ধাপে ধাপে চলে শয়তানের ১৯ (উনিশ) প্রকারের বাধা। শয়তান কিছুতেই সাধককে শেষ লক্ষ্যে যেতে দিতে চায় না। বার বার বাধা হয়ে দাঁড়ায় অনেক রকম অস্ত্র হাতে নিয়ে। তাই সাধককে সবসময় শয়তানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। এই যুদ্ধরত অবস্থারটির নাম হল নফসে লাউয়ামা। সাধক যখন সবরকম বাধা একে একে পার হয়ে যায়, তখনই সাধক শান্ত হয়ে যায় এবং পরিপূর্ণ তৃপ্ত পায়। পরিতৃপ্ত অবস্থানটির নাম নফসে মোতমায়েন্না বা প্রশান্ত আত্মা। এখানে আর শয়তানের কোন কাজ-কর্ম বা তাবেদারী চলে না। সাধক যখন এই অবস্থানে আসতে পারে, তখন জান্নাতের বার্তাটি দেখতে পায় এবং তৃপ্ত হয়। সুতরাং জিহাদ দুই প্রকার একটি শরিয়তি জিহাদ, অপরটি হাকিকতি জিহাদ। আপনার ভেতরে লুকিয়ে থাকা খান্নাসরূপী শয়তানের বিরূদ্ধে জিহাদ হল ফিছাবেলিল্লাহ তথা আল্লাহর পথে। তবুকের যুদ্ধে জয়লাভ করার পর মহানবী (সঃ) সাহাবিদের বলেছিলেন, এবার তোমরা আসল জিহাদের দিকে অগ্রসর হতে চেষ্টা কর। সুতরাং আমরা দেখতে পাই ইসলামের বিষয়গুলোর দুটি দিক আছে। একটি বাহিরের দিক অপরটি ভিতরের দিক। বাহিরের দিকটির কম বেশী ধ্যান ধারণা থাকলেই ভিতরের দিকটি কম বেশি ধরা পড়তে বাধ্য। তাই এটা বোঝার শক্তির আদান প্রদান হলে জ্ঞান ও রহস্যলোকের বিষয়গুলো সাধারণ মানুষ বুঝতে না পারলেও অস্বীকার করবে না। রহস্যলোকের ভেদ রহস্য তো নিজ দেহে অবস্থান করে। এই মারেফতি জ্ঞান গোপন। গোপনটিকে মহান আল্লাহ সবার কাছে প্রত্যক্ষভাবে তুলে ধরেন না। আল্লাহর বিশাল সৃষ্টি জগতের মাঝে কোথাও সামন্য ভুল নাই এবং থাকতে পারে না। মানুষের প্রবৃত্তির একটি অংশ এক লাফে আল্লাহতে গিয়ে মিশতে চায়। কিন্তু মাধ্যমটিকে জঞ্জাল মনে করে। তবে মাধ্যম ছাড়া কোন কাজ সিদ্ধ হয় না। মাধ্যমের ভিতর দিয়ে আসল ধরা পড়ে। মারেফতের জগতে পৌঁছাতে হলে কামেল মুর্শিদের শরণাপন্ন হওয়া অপরিহার্য, কারণ খান্নাসরূপী শয়তান অন্তরের ভিতরে জাগিয়ে তোলে। মানুষ কখনোই স্বেচ্ছাচারী কারো মাধ্যম নিতে চায় না। তাই গুরুর গোলামীর কথাটি বললেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন। খান্নাসই নিজের ভিতর এই আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করে। অথচ মানুষ খান্নাসকে দেখতে পায় না। তাই জীবন্ত শয়তানের পরিচয় জেনে নিতে হয়। তা না হলে ইসলামের কিছুই সঠিকভাবে বোঝার উপায় থাকে না। সূফীবাদ বোঝার তো প্রশ্নই আসে না। সূফীবাদকে বুঝতে হলে কামেল মুর্শিদের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করলেই কেবল তা বুঝে আসবে। কামেল মুর্শিদের ওছিলায় জিকির ও ধ্যান সাধনা দ্বারা মাখনরূপী রূহ ভেসে উঠে, তখন নিজের নফসটি আর দুধ থাকে না, বরং ঘোল তথা মাঠায় পরিণত হয়। মাঠা বা ঘোল দেখতে একদম দুধের মত। চোখের চাহনিতে ধরা পড়ে না। তখনই ধরা পড়ে যখন পান করা হয়। পান করার সময় বুঝতে পারে আমি তো দুধ পান করছি। অলি-আউলিয়াকে দেখতে দুধের মত। তবে কাছে না আসলে এর স্বাদ নেবার কোন উপায় থাকে না। ধ্যান-মোরাকাবার সাধনা করতে না পারলে, সাধারণ মানুষ আর অলি-আউলিয়াদের মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য তা বোঝা যায় না। তাই শয়তান থাকার স্থান হল একমাত্র জ্বিন ও মানুষের অন্তরে। যা দূর করতে হলে অবশ্যই একজন কামেল মুর্শিদের ওছিলা নিতে হবে এবং ওছিলা তালাশ করা প্রত্যেক মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য।

(Visited 577 times, 1 visits today)
Share