ইসলাম ও সূফীবাদ শীর্ষক সেমিনার

এইচ মোবারক

অশান্ত পৃথিবীতে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে পারে সূফীবাদ -খাজাবাবা কুতুববাগী ইসলাম ধর্মের সর্বোৎকৃষ্ট পথই হচ্ছে সূফীবাদ, একমাত্র সূফীবাদের রাস্তায় কোনপ্রকারের বিচ্ছিন্নতা বা উগ্রতার স্থান নেই। সকলপ্রকার সহিংসতা উপেক্ষা করে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শান্তির সুশীতল বাতাস বইয়ে দিতে পারে সূফীবাদের শিক্ষা।

গত ২৩ ডিসেম্বর ২০১৪, প্যান পেসিফিক সোনার গাঁ হোটেল-এর গ্রান্ড বলরুমে ‘ইসলাম ও সূফীবাদ’ শীর্ষক এক সেমিনারের প্রধান অতিথির বক্তব্যে কুতুববাগী কেবলাজান বলেন, যারা ইসলাম ধর্মের নামে বিশ্বজুড়ে ধর্মে ধর্মে, জাতিতে জাতিতে বিভেদের সৃষ্টি করে সহিংস তৎপরতা চালায়, তারা সঠিক পন্থায় নেই। তারা পথহারা, বিভ্রান্ত। এ ধরণের কোন কার্যকলাপ ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম, এই ধর্মে কোনপ্রকার হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, অহংকার, উগ্রতা, হানাহানির এবং কোন প্রতিবন্ধকতার স্থান নেই। মনে রাখতে হবে সূফীবাদ কোনপ্রকারের উগ্রপন্থা বা সহিংসতা সমর্থন করে না। তিনি আরও বলেন, ইসলাম ধর্মের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত এর প্রচার ও প্রসার হয়েছে একমাত্র সূফীবাদের মধ্য দিয়েই। সূফীবাদের নীতিতে রয়েছে, নম্রতা, ভদ্রতা, সহনশীলতা ও মহান সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভের শিক্ষা। বর্তমান সমাজের মানুষ দুনিয়াবীর নানান কর্মকা-ের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দিন দিন সৃষ্টিকর্তার হুকুম-আহকাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই আজ আমাদের সমাজে বিভিন্ন রকমের ছোট-বড় সমস্যা লেগেই আছে। এসকল সমস্যা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র রাস্তা হচ্ছে সূফীবাদ। সূফীবাদের শিক্ষা অনুসরণের মাধ্যমে মানুষ তার রিপুতাড়িত আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারে। আত্মা শুদ্ধ না হলে কখনো সঠিক মানুষে পরিণত হওয়া সম্ভব না। একজন মানুষ যত রকমের উপাসনা বা প্রার্থনা করুক না কেন, যদি তার অন্তরাত্মা শুদ্ধ না হয়, তাহলে কোনরকমের ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। তাই সর্বপ্রথম নিজের মন বা নফ্স কে পরিপূর্ণরূপে শুদ্ধতার আসনে বসাতে হবে। আর তা শুধু সম্ভব সূফীবাদের শিক্ষা লাভের মধ্য দিয়ে, যা একজন কামেল পীর বা মুর্শিদের কাছে তালিম নিয়ে শিখতে হয়। খাজাবাবা বলেন, জাগতিক কর্মচাপে অর্থ-সম্পদ ও বিভিন্ন লালসার মোহে আমাদের অন্তরাত্মা আজ মৃতপ্রায়। এই মরা দিল বা অন্তর নিয়ে যে কাজই করা হোক না কেন; তাতে কোন ফল লাভ  হবে না।

আমাদের দিলকে সৃষ্টিকর্তার পানে সদা জাগ্রত রাখতেই হবে। সূফীবাদ ব্যতীরেকে দিল জিন্দা করার অন্য কোন পথ বা উপায় নেই। মানুষের মধ্যে কর্ম তাগিদ থাকবে, অর্জনের প্রতিযোগিতাও থাকবে, আর এটাই স্বাভাবিক! কিন্তু সকল কর্মের শ্রেষ্ঠ কর্ম হচ্ছে নিজের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তাকে রাজি-খুশি রাখা। এই সাধনার জ্ঞান আপন মনে গেঁথে দিতে পারে একমাত্র সূফীবাদের শিক্ষা। সেই শিক্ষা মানবিক এবং একই সঙ্গে ঈমানেরও। খাঁটি ঈমানদার না হয়ে কবরে গিয়ে মানুষকে দেখতে হবে শুধু বিপদ আর বিপদ। ওই পরিস্থিতি হবে খুবই বিভীষিকাময়। তাই প্রত্যেককেই ঈমানের সাথে কবরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এটাই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ঈমানী দায়িত্ব। সূফীবাদই পারে মানুষের ঈমানের ভিত্তি দৃঢ় করে সঠিক ও শুদ্ধ রূপ এনে দিতে। সূফীবাদের পতাকাতলে শামিল হওয়ার সাথে সাথে প্রত্যেক মানুষের দিলের মধ্যে আশ্চর্য রকম একটা পরিবর্তন আসে। আর ঠিক তখন থেকেই একজন মানুষ নিজেকে বিশুদ্ধ মানুষের কাতারে অনুভব করতে পারবে। তাই সূফীসাধকেরা মানবসেবার কথাই বলেন। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা না থাকলে আত্মশুদ্ধি হয় না। মানুষকে ভালোবাসলে, সেবা করলে আল্লাহকে ভালোবাসা হয়।

কুতুববাগী কেবলাজান বলেন, সূফীবাদের অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে আদব। আদব হচ্ছে ঈমানদার ব্যক্তির অন্যতম একটা গুণ। আবদ বা বিনয় দিয়ে একজন মানুষ তার শ্রেষ্ঠ অর্জনকে খুব সহজে নিজের কজ্বায় আনতে পারে। আদবরে সাথে সাথে মানুষকে অবশ্যই সৎসাহসী হতে হবে। তবেই সে তার সঠিক পথে নির্ভয়ে চলতে পারবে। ধৈর্যশীলকে আল্লাহতায়া’লা অধিক পছন্দ করেন এবং ধৈর্যশীলরা সকল কর্ম সফলতার সাথে সম্পন্ন করতে পারে। আমাদের প্রত্যেককেই নিজ বুদ্ধি ও বিবেক সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। আর এই সকল দিকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে একটি মাত্র দিক, তা হলো বিশ্বাস। বিশ্বাস না থাকলে কোন গুণ-ই কাজে আসবে না। তাই সকল কিছুই একত্রে পাওয়া যাবে সূফীবাদের শিক্ষায়। সূফীবাদে তাই আদব, বুদ্ধি, মহব্বত, সৎসাহস, এইসব চারিত্রিক গুণাবলী অর্জনের শিক্ষা দেয়া হয়।

সেমিনারে খাজাবাবা কুতুববাগী কেবলাজানের দীর্ঘ দিনের আশেক সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষদূত আলহাজ্ব হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, দেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তার থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর দেখানো পথে চলা। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা পরিপূর্ণভাবে এই সঠিক পথে নিজেকে শামিল করতে না পারবো, ততক্ষাণ দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে না। তাই আমি বলবো, অতি সহজে দেশ ও জাতিকে বিপদের হাত থেকে মুক্তি দিতে  আজ সূফীবাদের শিক্ষাই ভরসা। আসুন, আমরা সকলে একত্রিত হয়ে সূফীবাদের দাওয়াতের জন্য কুতুববাগী কেবলাজান হুজুরের হাতে হাত রেখে ওয়াদাবদ্ধ হই এবং তাঁর দেখানো শান্তিরপথে চলতে চেষ্টা করি। আমার কাছে মনে হয় তবেই জাতি নাজাতের সন্ধান পাবে!

কুতুববাগী কেবলাজানের বাণী প্রচার কমিটির সভাপতি ও বিশিষ্ট শিল্পপতি মোহাম্মদ ইউনূছের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারের শুরুতে কেবলাজান হুজুরের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন, খাজাবাবা কুতুববাগী কেবলাজানের দীর্ঘদিনের ভক্ত-আশেক, বাংলাদেশ টেলিভিশনের পরিচালক (বার্তা), বিশিষ্ট সাংবাদিক কবি নাসির আহমেদ। উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল মান্নান, নারায়ণগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও মাসিক আত্মার আলো পত্রিকার সম্পাদকমন্ডলির সদস্য এবং কুতুববাগী কেবলাজানের বাণী প্রচার কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব জয়নাল আবেদীনসহ দেশের বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পপতি-ব্যবসায়ী ও সরকারী, বেসরকারী পদস্থ কর্মকর্তা, কুতুববাগ মোজাদ্দেদিয়া ওলামা মিশনের প্রখ্যাত আলেম ওলামা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। কুতুববাগী কেবলাজানের আশেক-মুরিদ চৌধুরী আদনান ও মেহেদী হাসান। তাদের সংক্ষিপ্ত অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, নকশবন্দিয়া মোজাদ্দেদিয়া তরিকা গ্রহণের পর কীভাবে তাদের আত্মার ও পারিপার্শিক জীবনের উন্নতি হচ্ছে এবং তারা সবাইকে সূফীবাদের শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের অন্তরাত্মাকে আয়নার মতো পরিস্কার করে ইহকালের শান্তি ও পরকালে মুক্তির আহ্বান জানান। সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন কুতুববাগী কেবলাজানের বাণী প্রচার কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মীর্জা মাহবুব বাচ্চু।

সূফী সেমিনারের কিছু ছবি

[slickr-flickr tag="sufi seminar 2014"]

(Visited 265 times, 1 visits today)
Share